আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, জরুরী ব্যবস্থা প্তয়োজন


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ /
আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, জরুরী ব্যবস্থা প্তয়োজন
  • মনিটরিং নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-আইজিপির : : চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং কালচারে জনজীবন দুর্বিষহ

ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি দিনদুপুরেও বিভিন্ন যানবাহনে ছিনতাই হচ্ছে অভিনব কায়দায়। ছিনতাইকালে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা।

এ সব কারণে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। অপরাধ দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বাহিনীর প্রধান আলী হোসেন ফকির চরম দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। বর্তমান সরকারের ২ মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে দায়িত্ব গ্রহণের। এখনো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী সংগঠন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ রিকশাচালকরা থানায় গিয়ে কাক্সিক্ষত সেবা না পাওয়ায় পুলিশের উপর আস্থা হারাচ্ছেন। দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকারকে দ্রুত দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অনেক কম। চাঁদাবাজ ও নানা অপরাধে জড়িতরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের শেল্টারে রয়েছে। ফলে থানা পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সমঝোতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে কাঁচা টাকার ভাগ নিচ্ছে থানার পুলিশ কর্মকর্তারা। নিজেদের চেয়ার রক্ষায় ওসি, এএসপি ও অতিরিক্ত এসপিরা প্রভাবশালীদের শেল্টারে থাকা অপরাধীদের সঙ্গে অপোষ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার ফলে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো তো বটেই, ঢাকার আশপাশের সড়ক এবং অলিগলিতেও হরদম ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই,খুন,রাহাজানির ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খোদ পুলিশ প্রধান আলী হোসেন ফকির মাঠ পুলিশের মনিটরিং না করে ৯৯ ভাগ পুলিশ সৎ বলে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য করছেন সাধারণ মানুষ। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অতি দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো জরুরি। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের মধ্যে সমন্বয় করে মাঠ পুলিশের চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে হবে। আইজিপিকে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নের মাধ্যমে অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর হারানো ইমেজ ফিরিয়ে আনতে হবে। বন্ধ করতে হবে সুবিধা না নিয়ে বা তদ্বির না শুনে দেশের থানাগুলোতে ওসি নিয়োগসহ মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন।

অন্যদিকে একজন এমপি হয়েও নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন নোয়াখালী-৬ আসনের এমপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ। সংসদেই আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার গাড়িতে এখনও হামলার কোপের দাগ রয়েছে। এমনকি বিটিভির এক সাংবাদিককে কুপিয়েছে এমন চিহ্নিত আসামিরাও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার জন্য মসজিদে দোয়া করায় এক ইমামের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে। আমাকে অস্ত্র হাতে কোপাতে আসার ভিডিও ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছেনা। সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার গঠনের পরে গত মার্চ মাসেই সারাদেশে ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে রাজধানীতেই খুন হয়েছেন ২৪ জন। সব থেকে বেশি কিলিং হয়েছে চট্টগ্রামে। সেখানে মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ ৬১জন খুন হয়েছে। ঢাকায় অপহরণের শিকার হয়েছেন ২০ জন। আর সারাদেশে ১০২টি। নারী ও শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ১৪৮৫টি। এরমধ্যে ঢাকায় ১১১টি। এছাড়া ২৮৫টি সিঁধেল চুরিসহ, ডাকাতি, ছিনতাই দস্যুতার ঘটনায় ৬৩৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। অথচ গেলো ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাসে ঢাকায় ১৬ খুনসহ সারাদেশে আড়াইশর অধিক হত্যাকা- ঘটেছে। ওই মাসে ঢাকায় এক ডজনসহ সারাদেশে ৬৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিলো ১ হাজার ১৮১টি।

এছাড়া এক হাজারের বেশি চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। তবে থানায় রেকর্ডকৃত মামলার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞমহল বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপি পুলিশের সঙ্গে জেলা পুলিশের কিংবা সদরের সমন্বয়ের অনেক ঘাটতি রয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়কার বিতর্কিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা পানিশমেন্টের বিপরীতে পদোন্নতি পাচ্ছেন। অনেকেই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে পছন্দমতো থানা ভালো ভালো জায়গায় পোস্টিং নিয়েছেন। এসব পুলিশ কর্মকর্তা পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেয়ে অর্থ কামাতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ.বি.এম নাজমুস সাকিব ইনকিলাবকে বলেন, সমাজে যখন হঠাৎ পরিবর্তন আসে তখন অস্থিরতা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে ২৪ পরবর্তী সময়ে সমাজের ভেতর যে চলমান কাঠামো ছিল সেটা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সময়কালে বিচার ব্যবস্থার দুর্বল চিত্রায়ণ দেখা গেছে। বিচার এর মধ্য দিয়ে একজন ভিকটিমের ক্ষোভ প্রশমিত হয়। সামাজিক কাঠামোগত ভাবে যখন আপনি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে পারবেন না তখনই মানুষকে দেখবেন প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠতে এবং আইন ভঙ্গ করার কাজে লিপ্ত হতে। বর্তমানে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে এবং এই সরকার যদি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরো বহু গুণে বেড়েযাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিএমপির মুখপাত্র (ডিসি) এনএম নাসিরুদ্দিন ইনকিলাবকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল, বিশেষ অভিযান, ব্লক রেইড, দেয়া হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। অপরাধমূলক যে সব ঘটনা ঘটছে, সেব ঘটনার ভিত্তিতে ও মামলার প্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। আসামিরাও গ্রেফতার হচ্ছে। আমাদের দিক থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।