ইউপি নির্বাচনে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট-বাড়ছে ইসির ক্ষমতা


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ণ /
ইউপি নির্বাচনে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট-বাড়ছে ইসির ক্ষমতা
  • প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ সুযোগ * চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত বেড়ে ২৫ হাজার * সম্পদের হিসাব ও আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক * মোট ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানতের অর্থ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়সীমা, প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, নির্বাচনী অপরাধের শাস্তি এবং সমান ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে ফল নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আসন্ন ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে।

১৬ সেপ্টেম্বর সংশোধিত বিধিমালায় সই করা হলেও বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জামানত ফেরতে বাড়ল ভোটের শর্ত: সংশোধিত বিধিমালায় জামানত ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। আগে এক-অষ্টমাংশ ভোট পেলেই জামানত ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে এবার প্রার্থীদের জামানত ফেরত পেতে আগের তুলনায় বেশি ভোট অর্জন করতে হবে।

ইউপি নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো সমান ভোটের ক্ষেত্রে ফল নির্ধারণের পদ্ধতি। এত দিন দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান ছিল। সংশোধিত বিধিমালায় সেই পদ্ধতি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সমান ভোট হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা হবে।

থাকছে না দলীয় প্রতীক: সংশোধিত বিধিমালায় ইউপি নির্বাচনকে নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের পর বিধিমালা থেকেও দলীয় প্রতীক বাদ দিয়েছে ইসি।

নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০টি, সাধারণ সদস্য পদের জন্য ১২টি এবং সংরক্ষিত সদস্য পদের জন্য ১০টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদের প্রতীকগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার, কলার ছড়ি, ঘণ্টা, ঘোড়া, চিংড়ি, জগ, টেবিল, টেবিলঘড়ি, টেলিফোন, দালান, দোতলা বাস, পাগড়ি, বেবিট্যাক্সি, ময়ূর, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, মোড়া, রেল ইঞ্জিন, সোফা ও হাঁস।

সংরক্ষিত সদস্য পদের প্রতীক হলো আলমারি, কলস, ড্রেসিং টেবিল, পালকি, ফলের ঝুড়ি, মাইক, সেলাই মেশিন, সূর্যমুখী ফুল, হরিণ ও হেলিকপ্টার। সাধারণ সদস্য পদের জন্য রাখা হয়েছে উট, কাপ-পিরিচ, ঘুড়ি, জাহাজ, টর্চলাইট, টিউবওয়েল, ট্রাক্টর, তালা, ফুটবল, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব ও মোরগ।

নির্বাচনী ব্যয়সীমায় পরিবর্তন: চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। আগে এই সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা। তবে সাধারণ সদস্য প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২ লাখ টাকাই রাখা হয়েছে।

নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে হবে। ২০ হাজার টাকার বেশি কোনো লেনদেন ব্যাংকিং মাধ্যম ছাড়া করা যাবে না।

সম্পদের হিসাব ও আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক: প্রার্থীদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নতুন কিছু তথ্য জমা দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। প্রার্থী ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ হলফনামার মাধ্যমে দিতে হবে। একই সঙ্গে সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হবে।

বিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচনী অপরাধের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আনা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে ইসি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।

কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে গুরুতরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে কমিশন সেই কেন্দ্রের ফল স্থগিত করতে পারবে। প্রয়োজনে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারবে ইসি। নির্বাচনী কাজে গণমাধ্যমকর্মীদের বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য বিশেষ সুযোগ: দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ সহজ করতে নতুন বিধিমালায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে এসব ভোটার ভোটদানের জন্য অন্তত ২১ বছর বয়সি একজন সহায়তাকারী সঙ্গে নিতে পারবেন।

তবে কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ওই সহায়তাকারী হতে পারবেন না। সহায়তাকারীকে ভোটারের পছন্দের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। এ ধরনের ভোটারের জন্য প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে পৃথক তালিকাও সংরক্ষণ করতে হবে।

নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন, জামানতের অর্থ বৃদ্ধি, সমান ভোটে পুনঃভোট, ব্যয়সীমা পরিবর্তন এবং প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে সংশোধিত বিধিমালায় ইউপি নির্বাচন পরিচালনায় বেশ কিছু নতুন কাঠামো যুক্ত হলো। এর ফলে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগের তুলনায় ভিন্ন নিয়ম ও ব্যবস্থাপনায় হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টের বিরুদ্ধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে। এ আদেশ সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে।

কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে কমিশন ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে। পরে অনুসন্ধানের পর প্রয়োজন মনে করলে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন।