

দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতার সুনির্দিষ্ট বার্তা দিয়েছে কারারুদ্ধ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ইমরান খানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়ার পর পিটিআই-এর পক্ষ থেকে এই নমনীয় অবস্থান সামনে এলো। দলটির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইমরান খান কারামুক্ত হলে তিনি সামরিক বাহিনী বা সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের সঙ্গে কোনো সরাসরি সংঘাতের পথে হাঁটবেন না।
বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুবাইয়ে অবস্থানরত পিটিআই-এর মুখপাত্র ও ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি এই পরিবর্তনের কথা নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংকট নিরসনে সেনাপ্রধান অসীম মুনির ‘সহানুভূতির হাত’ বাড়িয়ে দিয়ে এক অভিভাবকোচিত ভূমিকা পালন করতে পারেন। রাজনীতি ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার বছরের পর বছর ধরে চলা বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পিটিআই-এর এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিবর্তনের রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংঘাতের পথ ত্যাগ ও ঐক্যের বার্তা
সাক্ষাৎকারে জুলফিকার বুখারি বলেন, ধরে নেওয়া যাক কাল যদি ইমরান খান মুক্তি পান, তবে তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না যা দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়। সামরিক নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার (এস্টাবলিশমেন্ট) সাথে মুখোমুখি সংঘাতের কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। নিজের মনের কষ্ট ও ক্ষোভ দমিয়ে রেখে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের এই পরিস্থিতি সহ্য করে এগিয়ে যেতে হবে।
২০২৩ সালে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাঁর সমর্থকেরা সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ দেখিয়ে আসছিলেন। অসীম মুনিরকেই পিটিআই নেতারা ইমরান খানের কারাবাসের পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এমনকি পূর্বে ইমরান খান নিজেও সেনাপ্রধানকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক আইনি অগ্রগতির পর বুখারির এই মন্তব্য দলটির রণকৌশলে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছে।
তিনি সেনাপ্রধানকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সেনাপ্রধান যদি একদিন মনে করেন যে সংকট অনেক হয়েছে এবং এখন দেশের জন্য তাঁর অভিভাবক হিসেবে হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত, তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও চিকিৎসা নির্দেশনা
সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। ৭৩ বছর বয়সী প্রাক্তন এই শীর্ষ ক্রিকেটারের দৃষ্টিশক্তির গুরুতর অবনতি এবং রক্তচাপের তারতম্যসহ নানা শারীরিক জটিলতার ওপর ভিত্তি করে আদালত এই রায় প্রদান করেন। আদালতের এই নির্দেশকে সামরিক বাহিনী ও পিটিআই-এর মধ্যে উত্তেজনা কমানোর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পিটিআই নেতা বুখারি এই রায়কে ‘নতুন আশার আলো’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান যে, আদালতের নির্দেশনা মেনে পিটিআই সমর্থকেরা হাসপাতালের সামনে কোনো প্রকার ভিড় বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করবে না। তবে এখন পর্যন্ত স্থানান্তরের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াধীন থাকায় হাসপাতাল স্থানান্তরের বিষয়টি সরকারের চ্যালেঞ্জ আবেদন নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও অভ্যন্তরীণ সংশয়
দলীয় মুখপাত্রের তরফ থেকে সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও, কারাগারে থাকা ইমরান খানের নিজস্ব চিন্তাভাবনা এর সাথে হুবহু মিলবে কি না—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষকরা। ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, “ইমরান খান বন্দি থাকা অবস্থায় বাইরে থাকা পিটিআই নেতারা কতটুকু ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো দরকষাকষি বা আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
উল্লেখ্য, গত কয়েক মাসে পিটিআই-এর কাঠামোগত নেটওয়ার্ক অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রথম সারির অনেক নেতাই এখনো কারাবন্দি বা আত্মগোপনে রয়েছেন। গত আট মাস ধরে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ইমরান খানের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বেশ সীমিত ছিল। পূর্বে এক বার্তায় ইমরান খান আপসহীন অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেছিলেন, যে যা-ই করুক, আমি কারও কাছে নতিস্বীকার বা মাথা নত করব না।
সামরিক নেতৃত্বের প্রতি নমনীয় বার্তা দেওয়া হলেও, পিটিআই তাদের আন্দোলনের পথ পুরোপুরি ত্যাগ করেনি। বুখারি জানিয়েছেন, ইমরান খানের সুচিকিৎসা, পরিবারের সদস্য ও আইনি পরামর্শকদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ, মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি এবং তাঁর চূড়ান্ত মুক্তির দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে পদযাত্রা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হবে।
আত্মগোপনে থাকা কিংবা নির্বাসিত পিটিআই নেতারা এই কর্মসূচি সফল করতে পুনরায় সক্রিয় হবেন বলে বুখারি আশা প্রকাশ করেন। সব মিলিয়ে, সমঝোতার হাত বাড়ানোর পাশাপাশ রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এই দ্বিমুখী কৌশল এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :