

একটি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগীদের সাথে তাস খেলছেন চিকিৎসক।-এএফপি
‘অচেনা অনেক মানুষের সাথে ছোট একটি ঘরে থাকা খুবই অস্বস্তিকর। বাইরে যুদ্ধ চলছে, কিন্তু এখানে এমন মানুষও আছে যারা বহুদিন ধরে নিজের ভেতরের যুদ্ধের সাথে লড়ছে। বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজলেই নিলির ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। শৈশবের ট্রমার কারণে শব্দে অতিসংবেদনশীল এই তরুণীকে তখন ভিড়ভাট্টার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতে হয়, যেখানে বাইরের যুদ্ধের সাথে যেন তার ভেতরের ‘নিজস্ব যুদ্ধ’ও মিশে যায়।
নিরাপত্তার কারণে নাম পরিবর্তন করা ২১ বছর বয়সী নিলির অভিজ্ঞতা দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষেরা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রতিটি সাইরেনের শব্দ তার জন্য নতুন করে দুঃসহ অভিজ্ঞতা ডেকে আনে।
এএফপি জানায়, দেশটির কেন্দ্রীয় শহর হদ হাশারনের শালভাটা মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত নয় মাস ধরে চিকিৎসাধীন নিলি বলেন, ‘অচেনা অনেক মানুষের সাথে ছোট একটি ঘরে থাকা খুবই অস্বস্তিকর। বাইরে যুদ্ধ চলছে, কিন্তু এখানে এমন মানুষও আছে যারা বহুদিন ধরে নিজের ভেতরের যুদ্ধের সাথে লড়ছে।’
ইসরাইলে প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ, কোনো না কোনো প্রতিবন্ধিতার সাথে বসবাস করেন বলে ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে। তাদের জন্য এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
১৬ বছর বয়সী রেয়া আজমানভ, যিনি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতায় ভুগছেন, তার জন্য এই অনিশ্চয়তা বিশেষভাবে কঠিন। তার বাবা জিভ আজমানভ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নিয়মিত রুটিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বাভাবিকতা না থাকায় তার মধ্যে প্রচণ্ড চাপ ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।’
আজমানভ পরিবারের বাসায় সুরক্ষিত ‘মামাদ’ কক্ষ নেই। ফলে সাইরেন বাজলেই তাদের ভবনের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। রেয়ার মা ভীনা আজমানভ বলেন, ‘সে ভিড় একদমই পছন্দ করে না। অনেক সময় নিচে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।’ আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরের শব্দ, সাইরেনের আওয়াজ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের বিস্ফোরণ, সব মিলিয়ে তার মানসিক চাপ আরো বেড়ে যায়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করা সংস্থা ‘বেইত ইসি শাপিরো’র প্রশিক্ষণ প্রধান ইয়োভ ব্রাভার বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চলাচল-সীমাবদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য চ্যালেঞ্জ আরো বেড়ে যায়। ‘সবকিছু দ্রুত ঘটে, ফলে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।’ তিনি জানান, সহজপ্রাপ্য আশ্রয়কেন্দ্রের তথ্যও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধকালে সেবাদানকারীদের ওপর চাপও বেড়ে যায়। ‘বার্নআউট এখন একটি বড় সমস্যা,’ উল্লেখ করে তিনি জানান, তাদের সংস্থা পেশাজীবী ও পরিবারগুলোর জন্য একটি হটলাইন চালু করেছে।
শালভাটা কেন্দ্রের চিকিৎসাকর্মীদের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে, বিশেষ করে গুরুতর মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে। সাইরেন বাজলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নাকি রোগীদের পাশে থাকা—এই দ্বিধার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
কেন্দ্রটির মনোরোগ ইউনিটের প্রধান নার্স মেরাভ আগশাম বলেন, ‘এগুলো প্রতিদিনের নৈতিক দ্বিধা।’ এক রোগীকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি তাকে রেখে নিচে নেমে যাই। কিন্তু তখন গলায় একটা চাপা কষ্ট ছিল, যদি কিছু হয়ে যায়?’
অনেক রোগী আশ্রয় নিতে অস্বীকৃতি জানান। কেউ কেউ বলেন, ‘মিসাইল পড়ে আমি মারা গেলেও সমস্যা নেই, আমি মরতে চাই।’
কেন্দ্রটির পরিচালক শ্লোমো মেন্ডলোভিচ বলেন, রাতে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। ‘অনেকে গভীর ঘুমে থাকেন, কাউকে আবার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।’ এ অবস্থায় রোগীর স্বাধীনতা, দায়িত্ববোধ এবং নিজের নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নিতে হয় কর্মীদের।
তিনি বলেন, ‘আমি চাই সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে যাক, তবে যারা রোগীদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তাদের নিয়ে আমি গর্বিত।’
ডিপ্রেশন ও সংকট হস্তক্ষেপ বিভাগের পরিচালক উরি নিৎসান বলেন, তারা সংলাপ, উৎসাহ ও সহানুভূতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন। ‘সংকটের মুহূর্তে সম্পর্কের গভীরতা অনুভব করা যায়,’ বলেন তিনি।
সূত্র : এএফপি/বাসস
আপনার মতামত লিখুন :