

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা ক্রমবর্ধমানভাবে এমন এক অবস্থার দিকে যাচ্ছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণে মদ্য দিয়ে শেষ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, কৌশলগত ও সামরিক ব্যয়ের চাপ ওয়াশিংটনের জন্য এই যুদ্ধ বজায় রাখা কঠিন করে তুলছে এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, নতুন করে সংঘাত বাড়লে তা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তেল, গ্যাস এবং লবণাক্ত পানি পরিশোধন ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে, যার পরিণতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং বাণিজ্য ব্যাবস্থা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরান অভিযানের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। চলতি বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে, এবং দেশটির রাষ্ট্র কাঠামোর বড় অংশ অক্ষত রেখে আরও অনুগত নেতৃত্ব প্রতিস্থাপন করে।
ভেনেজুয়েলায় অভিজ্ঞতা থেকেই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, ইরানকেও একইভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া যেতে পারে। তবে, এই মার্কিন কৌশলটি ইরানের প্রেক্ষাপটে কার্যকর হয়নি। তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযানটি কোনো অনুগত সরকার বা অভ্যন্তরীণ পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তার অভ্যন্তরীণ অনুশাসন কাঠামোকে সুসংহত করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বয়ে তার ভূমিকা বিস্তৃত করেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর দৃঢ় রয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলো এর পেছনে ঘনিষ্ঠভাবে জোটবদ্ধ এবং বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ায় জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংগঠিত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউই ইরানের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে পারেনি, কোনো বিকল্প প্রশাসন গঠন করতে পারেনি এবং সামরিক বিজয়ের কোনো বাস্তব পথও চিহ্নিত করতে পারেনি। ফলে মনোযোগ ধীরে ধীরে সম্ভাব্য মার্কিন পশ্চাদপসরণের দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর প্রভাব বজায় রাখছে।
এই ফলাফলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত ভুল হিসাবের ফল। মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের ঐতিহাসিক গভীরতা, সামাজিক সংহতি এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন, যার পেছনে রয়েছে ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের মতো ঐতিহাসিক ক্ষোভ। ইরানের প্রযুক্তিগত ও শিল্প উন্নয়নও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, দেশটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন উৎপাদন এবং মহাকাশ সক্ষমতা সহ একটি দেশীয় প্রতিরক্ষা খাত গড়ে তুলেছে, যা বৈজ্ঞানিক ওসামরিক অবকাঠামোতে টেকসই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের প্রতিফলন ঘটায়।
একটি সুস্পষ্ট ব্যয়গত ভারসাম্যহীনতা মার্কিন অভিযানকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ইরানি ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করার জন্য প্রতিটি প্রায় ৪০ লাখ ডলার মূল্যের মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয়েছে। ছয় অঙ্কের নিম্ন মূল্যের ইরানি জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যবস্থাগুলো শত শত কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন নৌ সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর উপর সামরিক বোঝা বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুগতদের একটি ছোট বৃত্তের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষিতে, দেশটির ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রাক্তন পরিচালক জো কেন্ট ১৭ মার্চ পদত্যাগ করেছেন। তিনি নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনে একটি ‘ইকো চেম্বার’ (প্রতিধ্বনি কক্ষ) পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন ও মানসম্মত আন্ত:সংস্থা পর্যালোচনার অভাবের সমালোচনা করেছেন।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের প্রত্যাশিত ফলাফল হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের পাশাপাশি আংশিক সেনা প্রত্যাহার। একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক পশ্চাদপসরণ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি হ্রাস পাবে, অন্যদিকে ইরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব আরও বাড়াবে।
ইরান যুদ্ধে সামরিক বলপ্রয়োগের সীমার ক্ষেত্রে একটি ব্যাপক পরিবর্তনপ্রতিফলিত হচ্ছে, যেখানে প্রচলিত শক্তি প্রদর্শনের ব্যয় বাড়ছে এবং তার সুফল কমে আসছে। এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মুখে চাপ সহ্য করার ও কৌশলগতসহনশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাগুলো উন্মোচন করেছে।
আপনার মতামত লিখুন :