

পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেই পাস, কোন শিক্ষার্থী ফেল করলে পরীক্ষককে শোকজ ও পরবর্তীতে খাতা দেখতে না দেয়া, যেকোনভাবে হোক ফুলিয়ে-ফাপিয়ে রেজাল্ট দেখানো- এমনই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল পতিত আওয়ামী সরকারের আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা। যেখানে কেবল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করলেই ছিল ফেল হওয়ার সম্ভাবনা। আর অংশ নিলেই পাস। ফলে পাসের হার কখনো কখনো শতভাগ ছুই ছুই হয়ে যেতো। উত্তীর্ণ লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তাদের জন্য চালু করা হয় উচ্চশিক্ষার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে একের পর এক গড়ে তোলা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে এভাবেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল আওয়ামী সরকার।
তবে ২৪’র ৫ আগস্ট ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্টা আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে পুরনো সেই রীতি। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থায়। পাস করতে হলে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরতে হবে দেয়া হয়েছে সেই বার্তা। খাতা মূল্যায়নে থাকবে না কোন বাড়তি সুবিধা। যার প্রভাব পড়েছে চলতি বছরের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে। যদিও পরীক্ষায় কঠোর নজরদারি, যথাযথ মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে বিপর্যয় ঘটেছে প্রকাশিত ফলে। কিন্তু প্রকৃত মেধার মূল্যায়নও ঘটেছে দীর্ঘদিন পর।
বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পাসের রেকর্ড হয়েছে এবার। কমেছে জিপিএ-৫, শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, বেড়েছে শূণ্য পাস প্রতিষ্ঠানও। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করায় বিপর্যয় ঘটেছে সার্বিক ফলাফলে।
চলতি বছরের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষায় সার্বিকভাবে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। যা গতবছর ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে এটি ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। গতবছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন, যা গতবছর ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন, ২০২৪ সালে ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ফলাফল খারাপ নয়, বরং সুন্দর হয়েছে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষকরা মনখুলে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই কঠোর ছিল।
পরীক্ষায় ভালো করার কথা থাকলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ ফল করতে পারে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমাদের বোর্ডের ১৯৯৮ সালের আইন অনুযায়ী খাতা পরিদর্শনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানে আমরা এটি পরিবর্তন করেছি। যেসব শিক্ষার্থী পুনঃপরীক্ষণের জন্য আবেদন করবেন, তাদের খাতা সম্পূর্ণভাবে পুনঃপরীক্ষা করা হবে। কোথাও কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে, সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অতীতে ফল পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হতো। কিন্তু এবার আমরা আইনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর খাতা যথাযথভাবে পুনর্নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করেছি। যদি কোনো শিক্ষক মূল্যায়নকালে যথাযথ নম্বর না দিয়ে থাকেন বা অসাবধানতাবশত ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে অভিজ্ঞ রিভিউ কমিটির সম্মুখে সেই খাতা পুনরায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রিভিউ করা হবে। পরীক্ষার্থীকে তার প্রাপ্য নম্বর বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, এবার ৯টি সাধারণ বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। মেধার সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। সার্বিকভাবে পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
সাধারণ ৯টি বোর্ডে মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। এসব বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষায় এবার অংশগ্রহণ করে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। এই বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন।
কারিগরি বোর্ডের অধীনে এবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৭ হাজার ৯৬৪ জন। এই বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল আরও খারাপ হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফলেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। ৯টি সাধারণ বোর্ডে অংশ নেওয়া ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৩ জন ছেলে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮১৪ জন। ফলে ছেলেদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৭৬ জন মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৭৯৬ জন। মেয়েদের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবার ৪৭ হাজার ৩০৪ জন ছেলে এবং ৫৮ হাজার ৭০৫ জন মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ফল ভালো হয়েছে।
গত দেড় দশকের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এবারের ফলের অবনতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ছিল ওই সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। পরে মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার ধরনে বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে পাসের হারে ওঠানামা দেখা যায়।
২০১৭ সালে খাতা মূল্যায়নে নতুন মানদ- প্রয়োগের পর পাসের হার কমে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে। এরপর করোনাকালে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালে বিষয় ম্যাপিং ও বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করায় পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা এ যাবৎকালের অন্যতম সর্বোচ্চ হার।
করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক পরীক্ষাপদ্ধতি ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা ফিরলে পাসের হার আবার কমতে শুরু করে। গত বছর ২০২৫ সালে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে ২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এবারের ফল বিপর্যয়ে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অকৃতকার্যতার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এ দুটি মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে তুলনামূলক কঠোরতা এবারের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।
ফলাফলের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ফলাফলেও। এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে- এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি- এমন শূন্য পাস বা জিরো পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১২টিতে। এতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এবারের ফলাফলকে শুধু পাসের হার কমে যাওয়ার দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। কোন বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়েছে এবং কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ফলাফল খারাপ হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে পাঠদানের মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে নির্ধারিত মানদ- অনুসরণ করার কারণে এবার ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। তবে এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-ঘাটতিও সামনে এসেছে। তাই ফল ভালো দেখানোর চেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রকাশিত ফলে কোনো শিক্ষার্থী সংক্ষুব্ধ হলে ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে।
আপনার মতামত লিখুন :