গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গরু-মহিষের গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ৪:৪৪ অপরাহ্ণ /
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গরু-মহিষের গাড়ি হারিয়ে যেতে বসেছে

‘ওঁকি গাড়িয়াল ভাই—কত রব আমি পন্থের পানে চাঁইয়া রে’—গ্রামবাংলার প্রাণপ্রিয় এই গান যেমন এখন আর শোনা যায় না, তেমনি এক সময়ের জনপ্রিয় বাহন গরু ও মহিষের গাড়িও এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী যান ও এর সঙ্গে জড়িত গাড়িয়াল পেশা।

এক সময় রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় গরু ও মহিষের গাড়ির ছিল ব্যাপক প্রচলন। বিয়ে, উৎসব কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই এই বাহন ছিল অপরিহার্য। গ্রামবাংলার মানুষের প্রধান যাতায়াত ও মালবহনের মাধ্যম ছিল দুই চাকার গরু ও মহিষের গাড়ি। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনে এই বাহনের ব্যবহার ছিল ব্যাপক।

যুগের পরিবর্তন ও আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের আগ্রাসনে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। এখন শহরের শিশুদের কথা তো দূরের, গ্রামের অনেক শিশুও গরু কিংবা মহিষের গাড়ির সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। অনেক সময় শহরের শিশুরা গরুর গাড়ি দেখলে বাবা-মায়ের কাছে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে।

সাধারণত গরু বা মহিষের গাড়ির চালক বসতেন সামনের দিকে, আর যাত্রীরা বসতেন পেছনে। কৃষিজাত পণ্য ও মালামাল বহন করা হতো গাড়ির পেছনের অংশে। দুই দশক আগেও গ্রামবাংলায় যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনে এই বাহনের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা পরে অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন উপন্যাসেও দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত ও মালবহনে গরুর গাড়ির ব্যবহার উল্লেখ রয়েছে। বিখ্যাত লেখক এইচ রাইডার হ্যাগার্ডের ‘কিং সলোমনস মাইনস’ উপন্যাসেও গরুর গাড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়।

এক সময় বিয়েতে বর-বধূ গরু কিংবা মহিষের গাড়িতেই যাতায়াত করতেন। বরযাত্রী ও ডুলিবিবিরা ১০ থেকে ১২টি সাজানো গাড়িতে করে শ্বশুরবাড়ি যেতেন। গরুর গাড়ি ছাড়া গ্রামবাংলার বিয়ে যেন কল্পনাই করা যেত না।

গোদাগাড়ী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের মহিশালবাড়ী মহল্লার গরুর গাড়ির চালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমার বাপ-দাদারা সবাই গরুর গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আমিও প্রায় ৪০ বছর এই পেশায় ছিলাম। গভীর রাতে বিভিন্ন হাটে মালামাল বহন করে সংসার চালিয়েছি। কিন্তু এখন ধীরগতির কারণে গরু-মহিষের গাড়ির আর ব্যবহার নেই বললেই চলে।

বর্তমানে মাল পরিবহনে ট্রাক, পাওয়ার টিলার, লরি, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক যান এবং যাতায়াতে মোটরগাড়ি, অটোরিকশা, রেলগাড়ির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গরু ও মহিষের গাড়ি প্রায় বিলুপ্তির পথে। অথচ এই বাহনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এতে কোনো জ্বালানি লাগে না, নেই ধোঁয়া বা শব্দ দূষণ। এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও দুর্ঘটনাহীন একটি বাহন।

সচেতন মহলের মতে, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই পরিবেশবান্ধব যান ও পেশা রক্ষায় প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। নচেৎ অচিরেই গরু ও মহিষের গাড়ি শুধুই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।