

সউদী আরবের দুই পবিত্রতম নগরী মক্কা ও মদিনার সংলগ্ন এলাকায় আকাশে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধাতব খ- ও ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সউদী আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারি সামরিক জোটের দাবি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোঁড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পবিত্র নগরী দুটিকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হওয়ার সময় তাদের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে মাঝআকাশেই ধ্বংস করা হয়। তবে হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে পবিত্র নগরী দুটিকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর এ গুরুতর অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
সউদী সামরিক জোটের মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর রাডারে ধরা পড়ার পর পবিত্র মক্কা ও মদিনার আকাশসীমায় প্রবেশ করা দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলভাবে ইন্টারসেপ্ট (প্রতিহত) করা হয়। তবে মাঝআকাশে বিস্ফোরণের ফলে ক্ষেপণাস্ত্রের ভারী ধাতব অংশ ও ধারালো ধ্বংসাবশেষ মক্কা ও মদিনা প্রদেশের বেসামরিক জনবসতি ও খালি প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আশপাশের স্থাপনার সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হলেও বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। সউদী প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এ ঘটনাকে ইসলামি বিশ্বের পবিত্র স্থানসমূহের ওপর সরাসরি ‘বর্বর ও ক্ষমার অযোগ্য আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। আরব লীগের সদস্য দেশগুলোও এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রিয়াদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের সানা থেকে প্রচারিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হুথি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সউদী আরবের এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তু সবসময়ই সুনির্দিষ্ট সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো। পবিত্র মক্কা ও মদিনার মতো শ্রদ্ধেয় স্থানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার কোনো পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য আমাদের নেই। সউদী আরব বিশ্ব মুসলিমের সহানুভূতি কুড়াতে এবং নিজেদের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকতে এমন অপতথ্য ছড়াচ্ছে’। হুথিদের দাবি, তাদের প্রকৃত নিশানা ছিল সংলগ্ন অঞ্চলের সামরিক বিমানঘাঁটি ও রাডার স্টেশন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর পরপরই মক্কা ও মদিনার মতো স্পর্শকাতর এলাকার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার এ ঘটনা সউদী আরবের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আকাশ সুরক্ষার ওপর তৈরি হওয়া বিপুল ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পবিত্র নগরীগুলোর আকাশে সংঘাতের এই বিস্তার ইয়েমেন যুদ্ধকে আরও মারাত্মক আঞ্চলিক ও ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রিয়াদ বিমানবন্দর সচল : বিমানবন্দরকে আবারো ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ ঘোষণার হুমকি হুথিদের
এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের উপর্যুপরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ অচলাবস্থার পর সীমিত পরিসরে পুনরায় সচল হয়েছে সউদী আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর ‘কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। তবে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানী রিয়াদের আকাশসীমায় নতুন করে একাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে সউদী নেতৃত্বাধীন জোট ও বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী। এদিকে হুথি বিদ্রোহীরা এক বিবৃতিতে কিং খালিদ বিমানবন্দরকে এখনো তাদের ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়ে সব আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ও যাত্রীদের সেখান থেকে দূরে থাকার নতুন আলটিমেটাম দিয়েছে।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতে জানিয়েছে, গতকাল রোববার থেকে বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল দিয়ে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। পুনর্নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, টার্মিনাল-১ শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য এবং টার্মিনাল-২ সউদী জাতীয় ক্যারিয়ার পরিচালিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সব যাত্রীকে ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে টিকিটের স্ট্যাটাস ও ফ্লাইটের সময়সূচি যাচাই করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছে।
এর আগে চলতি মাসের ১০ অক্টোবর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক এ যোগাযোগ হাবটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল রিয়াদ।
বিমানবন্দর আংশিক চালুর ঘোষণার মধ্যেই গতকাল ভোরের দিকে রিয়াদের আকাশসীমায় হুথিদের পাঠানো ড্রোন প্রতিহত করার তথ্য নিশ্চিত করেছেন সউদী নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি। এর পাশাপাশি মক্কা, জেদ্দা, তায়েফ, ইয়ানবু এবং দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে একের পর এক আকাশপথে হামলার চেষ্টা প্রতিহত করেছে সউদীর প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।
সামরিক ও ভূ-কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, এডেনে হুথিদের সাম্প্রতিক আঘাত এবং রিয়াদের বেসামরিক বিমানবন্দরকে অবরুদ্ধ রাখার এই কৌশল মূলত সউদী অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনে সর্বোচ্চ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টিরই অংশ। আকাশসীমা ও বিমান চলাচলের এ তীব্র ঝুঁকির কারণে এমিরেটস, ইতিহাদ, ফ্লাইদুবাইসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সউদী আরবে তাদের নিয়মিত ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে, যা পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানি ও বিমান চলাচল করিডোরে চরম অনিশ্চয়তা বজায় রেখেছে।
সূত্র : গালফ নিউজ ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।
আপনার মতামত লিখুন :