প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরলে কর্মের দুয়ার বেড়ে যাবে


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ /
প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরলে কর্মের দুয়ার বেড়ে যাবে
  • বিদেশি বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ছে, জনজীবন-শিল্পে ফিরছে স্বস্তি

দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এরপরও দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে মানুষ। বৈশ্বিক সংকট ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে দেশের জ্বালানী পরিস্থিতি স্বাভাবিকতায় ফিরতে যাচ্ছে। গতকালও এক লাখ ৭৫ হাজার ঘনফুট ধারণক্ষমতার একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ ভিড়েছে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে। 

ওই কার্গো থেকে মার্কিন কোম্পানির এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। এতে দেশে চলমান গ্যাস সংকট অনেকটা কেটে যাবে। এর আগে গত বুধবারও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি নিয়ে একটি জাহাজ কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভিড়ে। জাহাজ দুটির সরবরাহ ক্ষমতা ১০৫০ থেকে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামের চারটিসহ দেশে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। আর এ কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতিও বেড়ে যাচ্ছিল। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং পাইপলাইনে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরলে এ সংকট কাটবে এমন প্রত্যাশা বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের। আর তাই নতুন দুটি জাহাজ আসায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, এখন দেশে গ্রিড-সংযুক্ত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৈনিক চাহিদা আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছুটা বেশি, যা চাহিদার ৩৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, দেশীয় সামিট পাওয়ারের টার্মিনাল থেকে ৫২০ মিলিয়ন এবং মার্কিন কোম্পানি পরিচালিত এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে পাওয়া যাচ্ছিল ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহ ৭০০-৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে স্থির ছিল। গত প্রায় দেড় মাস ধরে এলএনজি সংকটের কারণে সরবরাহ কমে গিয়েছিল। তাই দুটি এলএনজিবাহী কার্গো আসায় পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এলএনজি এবং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাস মিলিয়ে দেশে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২৩৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

তবে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ পাওয়া যায় ২৬০০-২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এদিকে বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের হিসাব বলছে, এখন দেশে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড় চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে জ্বালানির সংস্থান না থাকা। বিশেষ করে প্রধান জ্বালানি গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতায় দ্রুত গ্যাস সংকট দূর হলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত পদক্ষেপে দেশে লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং শিল্পে চাহিদা মেটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বেসরকারি খাতে ৫৩টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এ কেন্দ্র থেকে দৈনিক পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে চলতি মাসেই আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে আশা করা যায়, লোডশেডিং অনেকটা কমে আসবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

এদিকে বিদ্যুৎ খাতে নতুন সুখবর চলতি মাসেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। মাসের পর মাস পিছিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে। দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে দেশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে দেশে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে দীর্ঘদিন থেকে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। এর পরও দীর্ঘদিন পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ায় দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় এবং রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এ কারেণ ইতোমধ্যে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান, রফতানি আয়ে নতুন গতি, ডলারের সংকট কমে আসা এবং হুন্ডি-অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপে সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেছেন এবং বোয়িং ক্রয় নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। এই সফর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি আসবে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন সহযোগী চীন, জাপান, কোরিয়া, সউদী আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগের জন্য। এছাড়া চীনের অর্থনৈতিক করিডোরের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের পথে। প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিতে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন, যা দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দিবে। জিডিপির আকার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

একই সঙ্গে মক্কা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। বর্তমান জনশক্তি রফতানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে সেসব দেশে আরো ব্যাপক হারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে। অন্যদিকে সরকার তার কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আর তাই পরিবর্তিত বিশ^ রাজনীতি এবং অর্থনীতির যে গতিধারা তাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট দূর করা সম্ভব হয় তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার তিনি যে স্বপ্ন দেখছেন, তা বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর রাশেদ আল তিতুমীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে চলছেন। তার নির্দেশনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাত। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটের মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকটের সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। এর টেকসই সমাধান করা গেলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

সূত্রমতে, অর্থনীতির লাইফলাইন বিদ্যুৎ-জ¦ালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের সমাধান হচ্ছে। সংকট কাটাতে একযোগে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দ্রুত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্রুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশও আসতে পারে। এজন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) যথাসম্ভব ফার্নেস অয়েল মজুদ করতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন তেল বিতরণ কোম্পানিতে তেলের মজুদ বাড়াতে বেশি করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।

বিপ্পার সভাপতি ডেভিট হাসনাত বলেছেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং লোডশেডিং কমবে। অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বেসরকারি সব কেন্দ্র দেশের এ সময়ে পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো বকেয়া বিল। বিপ্পার সদস্যদের প্রায় ৭-৮ হাজার কোটি টাকা পাওনা আছে। দীর্ঘদিন বিল বাকি থাকায় অনেক কোম্পানি ব্যাংকের কাছে খেলাপি হয়ে গেছে। এখন সরকার এই বকেয়া দিয়ে দিলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজ থেকে তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, সরকার লোডশেডিং কমাতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে শিল্প খাতে গ্যাস দেয়ার সিদ্ধান্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত। এটি আদর্শ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে বিদ্যমান সংকট বিবেচনায় এ মুহূর্তে এর বিকল্পও নেই। এর মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়বে।

অবশ্য ইতোমধ্যে দেশের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারকে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা দেশের দ্বিমুখী সংকট সমাধান করবে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকারকে কয়লা ও ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। এটা করা গেলে যে গ্যাস এখন বিদ্যুৎ তৈরিতে যাচ্ছে সেটি শিল্প খাতে আসবে। এতে দুই সমস্যার সমাধানও হবে।

এদিকে গ্যাস সরবরাহ বাড়লে বন্ধ গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা যাবে। ফলে দেশে গ্যাসের সাথে বিদ্যুতের সংকটও কাটতে শুরু করবে। পুরোদমে সচল হবে কলকারখানার উৎপাদনের চাকা। সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও বাড়বে গ্যাসের সরবরাহ। চলতি মাসেই মোট ১০টি আমদানিকৃত এলএনজিবাহী জাহাজ আসার সিডিউল দেয়া হয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী সবক’টি কার্গো দেশে পৌঁছালে গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটবে বলে জানান পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। সরকারের এসব উদ্যোগে জ্বালানি খাতে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা চলতি মাসে যে দশটি এলএনজি কার্গো আসার সিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো যথাসময়ে এলে দেশে জ্বালানি সংকট কেটে যাবে।

গত ২১ জুলাইয়ের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ। ওই দিন মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে রহস্যজনক এক আগুনের পর দেশে গ্যাস সংকট শুরু হয়। এরপর বিকল টার্মিনাল সচলে দীর্ঘসূত্রতা সেইসঙ্গে আমদানিকৃত এলএনজি কার্গো যথাসময়ে না আসায় সংকট প্রলম্বিত হয়। গ্যাস বিদ্যুতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। কলকারখানায় উৎপাদনে রীতিমতো ধস নামে। বাসাবাড়ি এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। তবে এলএনজি জাহাজ আসায় গত ২২ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে। তখন থেকে দুটি টার্মিনালের সরবরাহ ৭০০-৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে। নতুন কার্গো আসায় সরবরাহ ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হবে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, সউদী আরামকোর মারিয়া এনার্জি নামে জাহাজটি থেকে সামিটে এলএনজি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। গতকাল আসা কার্গোটি থেকে এলএনজি সরবরাহ দেয়া হবে এক্সিলারেট টার্মিনালে। নতুন এলএনজি যোগ হওয়ায় সামিটের গ্যাস সরবরাহ ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনাল থেকে এখন সরবরাহ কমে ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। গতকালের নতুন কার্গো যোগ হওয়ায় এই টার্মিনাল থেকেও সাড়ে ৫০০ মিলিনয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া যাবে।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, তখন দুই টার্মিনাল থেকে সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিনয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশে গ্যাস সংকট কেটে যাবে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এক লাখ ৭৪ হাজার ঘনফুট তরলীকৃত গ্যাস ধারণক্ষমতার এই জাহাজটি গতকাল সকালে টার্মিনালে ভিড়ে। আগস্টের শেষ সপ্তাহে জাহাজটি অস্ট্রেলিয়ার ব্যারো আইল্যান্ড থেকে এলএনজি কার্গো নিয়ে বাংলাদেশের মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল অভিমুখে যাত্রা শুরু করে।

এদিকে ১০ সেপ্টেম্বর সউদী আরামকোর আরো একটি কার্গো টার্মিনালে ভেড়ার সিডিউল রয়েছে। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর পসকো, ১৬ সেপ্টেম্বর গানবোর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানবোর কোম্পানির আরো একটি করে কার্গো আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে। চলতি মাসে আরো দুটি কার্গো আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। নতুন করে আরো এলএনজি আমদানি করতে দরপত্র আহ্বান করেছে পেট্রোবাংলা।

এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানবাদী জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের এলএনজি বহনকারী জাহাজ চলাচলে কোনোরকম অসুবিধা হবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সাথে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এর আগে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় হরমুজ প্রণালীতে বাধার কারণে বাংলাদেশে এলএনজি কার্গো সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। এদিকে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরো চারটি কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।