

দেশে ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি, ষড়যন্ত্র আরও শুরু হয়েছে, জোরেশোরে শুরু হয়েছে উল্লেখ করে সকলকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, এদেশের মানুষ যেমন একাত্তর সালে স্বাধীন করেছে এই দেশ, এই দেশের মানুষ যেমন বিভিন্ন সময়ে তাদের নিজের অধিকারের রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে, নব্বইতে সোচ্চার হয়েছে, চব্বিশে সোচ্চার হয়েছে। আপনাদের সকলের কাছে আহ্বান থাকবে আবারও আপনাদের সোচ্চার এবং সচেতন হতে হবে। কারা কীভাবে ষড়যন্ত্র করছে, কারা কীভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলছে এবং ক্ষণে ক্ষণে অবস্থান পরিবর্তন করছে, এই সকল বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। আমাদের সকলকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আমাদের যে যুদ্ধ ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই যুদ্ধ কিন্তু এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
শনিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ছাত্রদলের উদ্যোগে ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৪২ জন শহীদ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন তাদের হাতে ছিলো শহীদদের ছবি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সঙ্গীত এবং এরপরই জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময়ে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্র দলের আফিকুল ইসলাম সাদ (মানিকগঞ্জ), মেহেদী (মুন্সিগঞ্জ), রিপন চন্দ্র শীল (হবিগঞ্জ), মো. আদিল (নারায়ণগঞ্জ), সাগর ইসলাম (পঞ্চগড়), রিয়াজ (বরিশাল), সিফাত হোসেন (মাদারীপুর), শাহরিয়ার হাসান আলভি (বাগেরহাট), কাউছার হোসেন বিজয় (লক্ষীপুর), সাব্বির হোসেন (লক্ষীপুর), তানভীর সিদ্দিকী (কক্সবাজার), তাহিদুল ইসলাম (বরিশাল), আকরাম খান রাব্বী (ঢাকা), মনির হোসেন (ভোলা), ইমন মিয়া (টাঙ্গাইল), মেহেদী হাসান রাব্বী (মাগুরা), শাহাদাত হোসেন শাওন (নোয়াখালী), নুরুল মুস্তফা (কক্সবাজার), সাফকাত সামির (ঢাকা), তাহমিদ ভুঁইয়া (নরসিংদী), সুমন পাটোয়ারি (দিনাজপুর), নূর হোসেন পিয়াস (নোয়াখালী), ওয়াসিম আকরাম (কক্সবাজার), ইমতিয়াজ হোসেন রিয়াজ (নোয়াখালী) এর পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজনদের মৃত্যুর ঘটনা এবং বর্তমান দুঃখ-কষ্টের কথা বলেন।
জুলাই সনদ তিন মাসেই আগেই সরকারের কাছে দেয়ার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি আজ থেকে তিন মাস আগে জুলাই সনদের ব্যাপারে আমাদের কী বক্তব্য, আমাদের কী অবস্থান সকল কিছু ব্যাখ্যা করে লিখিতভাবে আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছি। আমরা একটি রাজনৈতিক দল এই মুহুর্তে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নেই, একটি দল হিসেবে আমাদের কাছে সরকার বক্তব্য মতামত জানতে চেয়েছে আমরা পরিস্কারভাবে লিখিতভাবে দিয়ে দিয়েছি। এই সবগুলো বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে। এখন সম্পূর্ণ দায়িত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেরে। তারা কতটুকু কী করবে, না করবে, কাদের নিয়ে কী করবে না করবে সেটি তাদের ব্যাপার। এখানে আমাদের আর কোনো কিছু বলার নেই।
তিনি বলেন, কোনো কোনো ইস্যু বা কোনো কোনো আইডিয়াকে ফ্লোর করার চেষ্টা করা হচ্ছে অথবা কোনো কিছুকে লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তখনই আমরা খেয়াল করছি কিছু কিছু নন-ইস্যুকে ইস্যু করে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশবাসীর সামনে পরিস্কারভাবে আমি বলতে চাই, দেশটি কারো একক না, কোনো রাজনৈতিক দলের না, দেশটি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের, ২০ কোটি মানুষের। কাজেই ২০ কোটি মানুষের কাছে আহ্বান থাকবে, দেশটি আমাদের সকলের কাজেই এই দেশটিকে নিয়ে আমাদের সকলের ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, কারা কী করছে, কারা কী ভূমিকা রাখছে, কারা কী বর্তমানে বলছে? বলার মধ্যে পার্থক্য কী? তাদের অবস্থা ঘনঘন পরিবর্তন করছে এই সকল বিষয়ে আপনারা নজর রাখবেন।
প্রশাসনের এখনও স্বৈরাচারের ভূত রয়েছে জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, প্রশাসনের মধ্যে এখনো বিগত স্বৈরাচারের ভূত লুকিয়ে আছে। সেই ভূত এবং বর্তমানের নতুন কোনো যদি ভূত থাকে তারা কী ষড়যন্ত্র করছে, সেই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাই সচেতন থাকতে হবে। যদি আমরা সচেতন না হই এদেশকে টিকিয়ে রাখার মুশকিল হবে।
প্রত্যেকটি হত্যার বিচার অবশ্যই বিএনপি করবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আপনারা বিচারের কথা বলেছেন, বিচারের কথা শুধু আপনাদের কথা নয়। বিচারের কথা সমস্ত বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক মানুষের দাবি, প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের কথা। কাজেই কেনো আমরা সেটি করব না? অবশ্যই বিএনপি যখনই সুযোগ পাবে অবশ্যই নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে প্রত্যেকটি হত্যাকান্ডের বিচার, কারণ এটি আমাদের কমিটমেন্ট।
মিডিয়া নিয়ে তিনি বলেন, এই মুহুর্তে যদি আমরা মিডিয়া দেখি, আমরা দেখব একটি বিষয়কে ঘিরে বিভিন্ন রকম কিছু কিছু ম্যাসেজিং করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিছু একটি গল্প তৈরি করা হচ্ছে।
পুরান ঢাকার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনীকে কেনো ধরা হচ্ছে না প্রশ্ন রেখে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, কিছু কিছু দল পুরান ঢাকার ঘটনাটিকে ভ্রান্তভাবে উপস্থাপন করছে? যে ছেলেটি মারা গেছে তার সাথে হয়ত য্বুদলের সম্পর্ক আছে। কিন্তু যে খুন করছে বা যে হত্যা করছে তাকে অন্য জায়গা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। তাকে ধরা হচ্ছে না। ধরা হলো অন্যদেরকে। তাকে আসামী পর্যন্ত করা হয়নি বোধহয় এখন পর্যন্ত। কেনো হয়নি, কেনো ধরা হচ্ছে না। আমাদের পক্ষ থেকে তো একবারও বলা হয়নি অমুকে ধরা যাবে না, তমুককে ধরা যাবে না। আমরা বরাবরই বলেছি, অন্যায়কারী আইনের দৃষ্টি তার বিচার হবে। দলের সাথে তার কী সম্পর্ক কিচ্ছু যায় আসে না তাতে। তাকে দল কোনো রকম প্রশ্রয় দেবে না কেউ যদি কোনো অন্যায় করে থাকে।
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, প্রশাসন ধরছে না কেনো তাকে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেনো তারা বসে আছেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চালায় কে? বিএনপি তো চালায় না। চালাচ্ছে তো সরকার। তাহলে সরকার কেনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না তাদের (খুনীদের) বিরুদ্ধে, সেটি দলের হোক বা অন্য কেউ হোক কেনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যা বলে তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি। কিন্তু আমরা কী দেখেছি? অনেকগুলো রাজনৈতিক দলকে দেখেছি.. কারো ব্যাপারে আমরা দেখেছি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ভূমিকা যখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়্উার রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন আমরা দেখেছি দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা কে করেছে? কাদের পক্ষ থেকে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য এদেশের মানুষকে যুদ্ধের ডাক দেয়নি, ডাক দেয়ার দায়িত্ব তাদের ছিলো। কিন্তু ডাক না দিয়ে আমরা দেখেছি সবাই মিলে কোনো দেশে লুকিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। কে ছিলো এই দেশে? এদেশের জনগণ ছিলো, এদেশে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলো।যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারা বিভিন্ন সেক্টার কমান্ডারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আমরা কাউকে দেখেছি, দূরের একটি দেশের গান গাইতে আবার কাউকে দেখেছি একটি প্রতিবেশি দেশের গান গাইতে।এখন তো দেখা যাচ্ছে বিএনপি ছাড়া বিভিন্ন দল বিভিন্ন দেশের গান গাইছে বাংলাদেশে।
তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে আমি জোর গলায় বলতে চাই, বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশের জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস, বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্বে, বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে। বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশই সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ ঠিকানা। আজকে আবারও পরিস্কারভাবে তুলে ধরতে চাই, যে হত্যাকা- জুলাই-আগস্টে হয়েছে, যে হত্যাকা- গত ১৫ বছর হয়েছে আমাদের সুযোগ আসলে ইনশাল্লাহ প্রত্যেকটি হত্যাকা-ের বিচার করব। যত সময় লাগুক ধীরে সুস্থে প্রত্যেকটি হত্যার বিচার করব।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একটা কথা পরিস্কার করে বলতে চাই, যে ঘটনাগুলো ঘটছে সরকারকে আহ্বান জানাব, অতিদ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত যারা অপরাধী তাদেরকে বের করে শান্তির ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় জাতি আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না, জাতিকে আপনাদেরকে দায়ী করবে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে নেয়ার সময় এসব সমস্যা তৈরি করার জন্য।
বিএনপি কোনদিন অন্যায়কে সমর্থন করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা যারা ত্যাগ স্বীকার করেছে আর কিছুদিন ধরয্যের সঙ্গে আপনারা অপেক্ষা করুন গণতন্ত্রের জন্যে এবং সবাইকে বিরত রাখুন কেউ যেন অন্যায় কাজ করতে না পারে। বিএনপি কোনোদিন কোনো অন্যায়কে সমর্থন করেনি। বিএনপি কখনো করবে না।বিএনপি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অতীতেও করেছে এবং এবারও করবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ব্যবস্থা রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন করে একটা নির্বাচন দ্রুত চাই। কারণ গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নাই। আর গণতন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচন নেই বলে আজকে দেশে এই ঘটনাগুলো ঘটছে, আইনশৃঙ্খলার ঘটনার ঘটনাগুলো ঘটছে, আইনশৃঙ্খলা অবণতি ঘটছে, মৃত্যু বাড়ছে, দুবৃর্ত্তরা সুযোগ নিচ্ছে কারণ তাদের পেছনের জনগনের সমর্থন নেই। কিন্তু একটা নির্বাচিত সরকার আসলে নিসন্দেহে সেটা শক্তিশালী সরকার হবে। তিনি বলেন, আমি আবারও এই আশার কথা বলতে চাই যে, আমরা নিশ্চয়ই সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ থেকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।’
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বক্তব্য রাখেন।
আপনার মতামত লিখুন :