সিলেটে বানভাসি মানুষের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুলাই ২, ২০২২, ৭:১১ পূর্বাহ্ণ /
সিলেটে বানভাসি মানুষের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ

সিলেট নগরীর এ ব্লকে উমরশাহ তেররতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নগরীর একটি আশ্রয়কেন্দ্র। গোটা এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে এসে উঠেছিলো ৩২টি পরিবার। পানি নামায় বেশির ভাগ পরিবারই বাড়ি ফিরেছে। তবে এখনো ৮টি পরিবার বাড়ি যেতে পারেনি। বাসায় পানি। দুই সপ্তাহ ধরে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে।

আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা জানিয়েছেন- ‘যাওয়ার জায়গা নেই। এ কারণে আধপেটা খেয়ে স্কুলেই রয়েছি। পানি কমলে বাড়ি যাবো।’- এই আশ্রয়কেন্দ্রের মতো সিলেটের অন্তত ৪ শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থায় একই।

বাড়িঘরে পানি। অর্ধেক মানুষ ফিরলেও অর্ধেক ঘরে উঠতে পারেনি। এই অবস্থায় একদিন পানি স্থির থাকলে পরের দিনই নামে ঢল। পানি বেড়ে যায়। বানের পানি ওঠানামার এই খেলায় অসহায় হয়ে পড়েছেন বানভাসি মানুষ। স্কুলে কিংবা বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী এসব মানুষের দীর্ঘ হচ্ছে প্রতীক্ষা। ওসমানীনগরের সাদিপুরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা আতিক মিয়া।

জানালেন- ‘পরিবার নিয়ে বাড়ি ছেড়েছি ১০ দিন আগে। আছি আশ্রয়কেন্দ্রে। গ্রামের পর গ্রামে বাড়িঘরে পানি। এই পানি দ্রুতগতিতে নামলেও ৪-৫ দিন লাগবে। কিন্তু পানি নামছে না। কখনো বাড়ে, আবার কখনো স্থির হয়েই থাকে। এই অবস্থায় এবারের ঈদ হয়তো আশ্রয়কেন্দ্রেই করতে হবে। সীমান্তবর্তী উপজেলা জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সিলেট সদরেও আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমেছে।

এ কারণে ওইসব এলাকার ৭০ শতাংশ আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ত্রিশ শতাংশের মতো আশ্রয়কেন্দ্রে আছে মানুষ। কোম্পানীগঞ্জের হাসপাতালের বাসিন্দা আব্দুল হেকিম ও আব্দুল মোতালিব জানিয়েছেন- ‘বন্যার পানি তাদের বাড়িও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন যাবেন কোথায়। এ কারণে এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।’ স্থানীয় জনপ্রনিধিরা জানিয়েছেন- কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুরে কয়েক হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা অন্যের বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় রয়েছেন। সরকার থেকে তালিকা নেয়া হয়েছে।

এদিকে- সিলেটের জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেনি কেউই। বরং উজানের ঢলে আরও পানি বেড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে লোকজন রান্না করা খাবার পরিবেশ করছেন। বন্যা স্থায়ী রূপ নেয়ায় তাদের বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। এতে করে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অসহায় অবস্থায় কাটাচ্ছেন দিন।

সিলেটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য মতে- সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর চারটি পয়েন্টে এখনো পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কানাইঘাটে সুরমা, জকিগঞ্জে অমলসীদ, বিয়ানীবাজারে শ্যাওলা, ফেঞ্চুগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার উপরে রয়েছে। তবে- উজান থেকে আসা ঢলের স্রোত কিছুটা কমে যাওয়া পানি স্থির হয়ে আছে। সুনামগঞ্জেও পানি থাকার কারণে সিলেটের পানি নামার জায়গা নেই।

এ কারণে বন্যা স্থায়ী রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এদিকে- সরকারি তথ্য মতে; সিলেট বিভাগে সোয়া কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৫ জন। বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৬ লাখ ২২ হাজার ৯৬৮টি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের প্রায় ৩০ লাখ লোকজন।

সিলেট জেলা ও মহানগরে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ জন, মৌলভীবাজারে ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৬ এবং হবিগঞ্জে ৮৩ হাজার ৪৯০ জন। সিটি করপোরেশনসহ ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩ পরিবার। মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ জন। আর কাঁচা ঘরবাড়ি বন্যায় ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ হাজার ৯১টি।

সিলেট সিটি করপোরেশনসহ জেলায় ৬১৪টি আশ্রকেন্দ্রে ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৮ জন আশ্রয় নেন। বরাদ্দ মোট ১ হাজার ৬১২ টন চাল, ২০ হাজার ২১৮ প্যাকেট শুকনা খাবারের মধ্যে ১৯ হাজার ৯১৮ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। নগদ এক কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে বরাদ্দকৃত ৬৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।