

প্রতিবেদকঃ
গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে হঠাৎ রাজপথে অরাজকতা শুরু হয়েছে। রাজপথে আন্দোলনের নামে চলছে জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের মতো হিংসাত্মক ঘটনা। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা জানান, শ্রমিক আন্দোলনের নামে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ অরাজকতা করছে। এমনকি কিছু গার্মেন্টস মালিক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন রাজপথের চলমান অরাজকতার নেপথ্যে। প্রশ্ন হলো গার্মেন্টস শ্রমিকের ব্যানারে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অরাজকতার সুযোগ পাচ্ছে কেন? এ পরিবেশ সৃষ্টি করলো কারা? ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াত ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের’ ক্ষেত্র তৈরিতে একে অপরের দিকে আঙ্গুল তুলছেন। বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, ‘আওয়ামীলীগকে মাফ করে দিয়েছি’।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ‘রিকনসিলিয়েশনের’ প্রস্তাব দিয়েছেন। যে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের তিন দিন আগেও শেখ হাসিনাকে সারাজীবন ক্ষমতায় রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন; মরণের পরেও শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন; তাদের এজেন্টরাই বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে আছেন। আর দেড় যুগ জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা দলীয় নেতাদের থাকতে হচ্ছে ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে।
‘রিকনসিলিয়েশন’, ‘মাফ করে দেয়া’, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় মনোভাব’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দিল্লির প্রতি নতজানু চেতনা’ দেশের ভেতরে থাকা হাসিনার অলিগার্কদের বেপরোয়া করে তুলেছে। ‘হাসিনা ডিসেম্বরে ফিরবেন’ এমন ঘোষণার পর দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে হাসিনার ফেরার ‘ক্ষেত্র তৈরি’ করতেই যেন গুপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা গার্মেন্টস শ্রমিকদের ব্যানারে রাজপথে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই ৬৭০টি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অবশ্য প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকির স্ত্রী গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রভাবশালী নেত্রী তাসলিমা আক্তার সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক দাবি-আন্দোলন ও গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এ যেন খাল কেটে কুমির আনার মতোই অপচেষ্টা চলছে! সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে মেতে উঠেছে। বাউলশিল্পী আবদুর রহমান বয়াতির ‘একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া জনম ভইরা চলিতেছে’ গানের প্রতিধ্বনির মতোই ঘটছে। দিল্লিতে বসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ‘ডিসেম্বরে দেশে ফিরবো’ ঘোষণা দিয়েছেন; আর সেটাকে কেন্দ্র করে হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্র তৈরি করতে অরাজকতা শুরু হয়ে গেছে। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, রাজনৈতিক সচিব, ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতাসহ প্রায় এক ডজন নেতা বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের নেপথ্যে ষড়যন্ত্র রয়েছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজনই গ্রার্মেন্টস শ্রমিকের ব্যানারে রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘পোশাকশিল্পের মালিকেরা
যারা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করছে। দুঃখজনক বিষয় হলো পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে কিছু শিল্পমালিক জড়িত, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীও আছেন’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বোধোদয় যেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে; জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল/রক্ষঃপুরে। হায়, তাত, উচিত কি তব এ কাজ?’ পঙক্তির মতোই শোনাচ্ছে। একের পর এক মিছিল করছে আওয়ামী লীগ অথচ পুলিশ নীরব! রাজপথে অগ্নিসংযোগ, অঘটন ঘটছে, অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হচ্ছে; অথচ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভাবখানা যেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কিছুই করার নেই। তারা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম? নাকি ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’!
সরকারের ভেতর থেকে কেউ কেউ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করে তোলার ক্ষেত্র তৈরি করছেন? তা না হলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে শিল্পমালিক, সাবেক এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জড়িত গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা কেন?
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরে আসার ঘোষণা ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও উত্তেজনা চলছে অনেক দিন থেকে। তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার হুঙ্কার দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলটির পলাতক নেতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, ডিসেম্বর মাসে হাসিনার এই ফেরার ঘোষণাটি মূলত রাজনৈতিক কৌশল; নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার প্রয়াস হতে পারে। কূটনৈতিক ও সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ভারত থেকে হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের বিষয়টি সহজ নয়; এ নিয়ে আইনি ও আঞ্চলিক কূটনীতির জটিলতা আছে। তারপরও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই বাকশালী চেতনায় ‘মগজ ধোলাইকৃত’ নেতাকর্মী। এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, হাসিনা নির্দেশ দিলেই তারা ফড়িংয়ের আগুনে ঝাঁপ দেয়ার ঝুঁকি নেবেন।
যার প্রমাণ গোপালগঞ্জ জেলা এখনো আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে ষেখানে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরাই আওয়ামী ক্যাডারদের প্রটেকশন দিচ্ছেন। এনসিপির নেতাদের সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাদের পিটুনি খেয়ে সেনাবাহিনীর গাড়িতে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। ৩১ অক্টোবর জামায়াতের নেতৃত্বে জোট খুলনা লংমার্চে গোপালগঞ্জ অতিক্রমের সময় ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান উঠেছে। ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরা নিয়ে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে তা ওপেন সিক্রেট। অথচ সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের কেউ কেউ এতদিন জেগে জেগে ঘুমিয়েছেন!
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, ‘জামায়াত রাজপথকে উত্তপ্ত করছে এবং আওয়ামী শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে আগুন দিচ্ছে। ‘সরকারের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দেবো’-লংমার্চ থেকে জামায়াতের আমিরের এমন বক্তব্যের পর শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। এর দায় কি জামায়াত এড়াতে পারে? জামায়াত রাজপথকে উত্তপ্ত করছে, আর আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ’।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যতই অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করুক; মানুষের চোখে ধুলো দেয়া সম্ভব নয়। সরকারের কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কিছু অদক্ষতা এখন ওপেন সিক্রেট। সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট। সে ঢেউ বাংলাদেশে আছড়ে পড়েছে। তারপরও বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। সরকারের এসব পজেটিভ কর্মকাণ্ড দায়িত্বশীলরা প্রচার করতে পারেনি। দেশের অর্থনৈতিক সংকট পূর্বের ধারাবাহিকতা। বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় বেকারত্ব বাড়ছে। একের পর এক গার্মেন্টস বন্ধ হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন কর্মজীবী মানুষ। ব্যাংকগুলো ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ফোকলা করে দিয়ে গেছে। এসব বিষয়ে জনগণকে জানাতে সরকারের দায়িত্বশীলদের কোনো পদক্ষেপ নেই। তারা অনেকটা প্রতিযোগিতা করেই প্রশাসনে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য চালাচ্ছেন। নিয়োগ-বদলিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় তুলেছে। টাকা পেলেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এমনকি দিল্লির চেতনাধারী আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক সরকার হলেও সবকিছু আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সে সুযোগ নিচ্ছে আমলারা। আইনশৃঙ্খলার বিপর্যয়কর অবস্থা। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা দলের নেতাকর্মীদের পাত্তা না দিয়ে আমলাদের অধিক গুরুত্ব দেয়ায় সরকার ক্ষমতাসীন দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে শেকড় পর্যায় পর্যন্ত দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা উপেক্ষিত। মিরপুরের রাড্ডা হাসপাতাল ভাঙচুর কাণ্ডে বিএনপি পরিবারের পরীক্ষিত সদস্য সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ বৃষ্টিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। পদত্যাগের তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন আসন শূন্য ঘোষণা করেছে। আবার নিজ নির্বাচনী এলাকায় মাদকসেবীদের পাকড়াও করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পিস্তল হাতে দৌড় দেয়ায় বিএনপি পরিবারের সদস্য ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অথচ প্রশাসনে উল্টো ঘটনা আছে।
পুলিশের আইজি আলী হোসেন ফকির ঘোষণা দেন ‘সরকারের নির্দেশ পেলেই ক্রসফায়ার করা হবে’। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সর্বমহল থেকে আইজিপির পদত্যাগের দাবি ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, একাধিক মন্ত্রী এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে জানান, ‘সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে বিশ্বাসী নয়’। আইনের রক্ষক হয়ে আইনবিরোধী এবং সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েও আইজি আলী হোসেন ফকির স্বপদে রয়ে গেছেন। বরং আইজি যাতে স্বপদে থাকতে পারেন সে জন্যই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আইজিপি সহজ সরল মানুষ তাই ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন’। এর অর্থ কি দাঁড়ায়? রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক দলের চেয়ে আমলাদের রক্ষায় অধিক মনোযোগী হয়ে পড়েছে।
পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠক করে পোশাক কারখানার মালিকদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে জানিয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘কিছু শিল্পমালিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ করেছেন। তাঁদের তালিকা দিতে মালিক সংগঠনের নেতাদের বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত শ্রমিকনেতা ও সংগঠনগুলোর নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি ঠিক করা হয়েছে। কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, সেটা আমরা চাই না। শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। এ অস্থিরতার পেছনে প্রকৃত কোনো শ্রমিক জড়িত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে শ্রমিকদের ব্যানারে যে আওয়ামী লীগ নেতা, গার্মেন্টস মালিকরা রাজপথে অরাজকতা করাচ্ছেন তাদের কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে?
কিন্তু রাজপথের কি দৃশ্য দেখলো দেশের মানুষ! রাজধানী ঢাকার মিরপুর, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশের গার্মেন্টস পল্লীগুলোতে তথাকথিত শ্রমিকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, কিছু গার্মেন্টস মালিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু পুলিশ বাহিনীকে দেখা গেল ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ঠেকানোর আদলে শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলনের সময় যেমন পুলিশের গাড়ি থেকে আন্দোলনকারীদের লাশ রাস্তায় ফেলে দেয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনা মানুষ দেখেছে; তেমনি আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের ধরে ধরে রাস্তায় পৈশাচিকভাবে জুলাই অভ্যুত্থান ঠেকানোর কায়দায় রাস্তায় আছড়ে ফেলা হচ্ছে। সে দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের রাস্তায় আছড়ে ফেলার পৈশাচিক কাণ্ড কি আন্দোলনকারীদের আরো মারমুখী করে তোলার চেষ্টায়?
বিএনপিপন্থি সিনিয়র সাংবাদিক মারুফ কামাল খানের একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তার বক্তব্য এমন, ‘বিএনপি অনুসারী হিসেবে দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় বলছি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন নেতাকেও বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে দেখিনি; অথচ বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাদের মধ্যে বহু নেতাই আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল দেখছি’। সিনিয়র এই সাংবাদিকের বক্তব্যে বিএনপির ভেতরের চিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা পলাতক। দেশি-বিদেশি প্রচেষ্টায় দলটির তথাকথিত ক্লিন ইমেজের নেতাদের নিয়ে রিফাইন আওয়ামী লীগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা ব্যর্থ। ১৪শ’ ছাত্র-জনতাকে হত্যার পর সামান্যতম অনুশোচনা নেই। অথচ সেই আওয়ামী লীগের জন্য মায়াকান্না! জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আওয়ামী লীগকে মাফ করে দিয়েছি’। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এমনকি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা আওয়ামী লীগকে ন্যায়বিচার দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের নামে রাজনৈতিক বিবাদ মিটিয়ে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টারা ফ্যাসিন্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের ইস্যু তুলেছেন মূলত ১৮ বছর ধরে মাঠের রাজনীতিতে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা নেতাদের সঙ্গে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দূরত্বের কারণেই। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে রাজপথে যারা জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, বছরের পর বছর কেউ কারাগারে ছিলেন, কেউ পালিয়ে থেকেছেন, কেউ আদালতের বারান্দায় ঘুমিয়েছে তাদের বেশির ভাগই ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সরকারে জায়গা পাননি। উল্টো দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন উড়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ পদে জুড়ে বসার সংখ্যাই বর্তমান সরকারে বেশি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া সেলেও দলের সমর্থক সিনিয়র সাংবাদিকদের জায়গা হয়নি। যারা প্রধানমন্ত্রীর চার পাশে জায়গা পেয়েছেন তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে নেই দেশের সাংবাদিক ও দলের নেতাদের সঙ্গে পরিচিতি-সম্পর্ক; মিডিয়া সেলে যারা রয়েছেন তাদেরও একই অবস্থা।
ফলে সরকার থেকে রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু কি তাই! প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের পর দেশে ফেরার সময় বিমানে ত্রুটি ধরা পড়ে। এ নিয়ে দেশে তোলপাড় শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি! অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ভয়ঙ্কর এই খবর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্টরে তেমন গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হলো না। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর প্রেস বিভাগ থেকে জানানো হলো, ‘বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটির পর প্রধানমন্ত্রী অন্য বিমানে দেশে ফিরতে পারতেন; কিন্তু সাধারণ অন্য যাত্রীদের নারিতা বিমান বন্দরে ফেলে রেখে নিজে দেশে ফেরেননি’। প্রধানমন্ত্রীর বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির চেয়ে এদের কাছে যেন প্রধানমন্ত্রী অন্য যাত্রীদের ফেলে দেশে ফেরেননি সেটাই বড় খবর!
রাজপথে গ্রার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না। পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের উসকানি ও নাশকতার মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতনের দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারখানায় আক্রমণ ও আগুন দেয়া, পুলিশের গাড়ি ও স্থাপনায় হামলার মতো স্পর্শকাতর কর্মকাণ্ড শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থি।
শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে পলাতক অপশক্তির অস্থিরতা সৃষ্টির তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিকরাই, বাড়বে বেকারত্ব ও ব্যাহত হবে দেশের অর্থনীতি। নাশকতায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সাধারণ শ্রমিকদের কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, গুজব বা উসকানিতে কান না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাত ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় যেকোনো যৌক্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রমবান্ধব এ সরকার সবসময় শ্রমিকদের পাশে থাকবে’।
দেশের পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে পোশাকশিল্পে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা ধ্বংস করার পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না’।
দেশে যখন শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা চলছে; তখন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং দলটির সাথে গোপন আঁতাত বা বোঝাপড়ার অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে। বিএনপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের একটি গোপন রাজনৈতিক বোঝাপড়া বা আঁতাত তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত দাবি করছে যে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সহজ হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসাকে প্রতিহত করার অঙ্গীকার করলেও একে অপরের বিরুদ্ধে এই দোষারোপের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগের অলিগার্কদের বলিয়ান করছে।
আপনার মতামত লিখুন :