প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শহথ গ্রহণ করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ফাইল ছবি
এক বছর আগে একটি গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূচিত্র পাল্টে দিয়েছিল। সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সঙ্কট নিরসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কারের পথে যাত্রা শুরু করে। এক বছর পর বলা যায়, এই সরকার কিছু মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, তবে ভবিষ্যতের জন্য তা কতটা টেকসই হয়, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচনের স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক সংলাপ এবং সংস্কারের আইনি বাধ্যবাধকতার ওপর।
সরকারে বিভিন্ন অর্জনের তালিকার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে, রূপান্তর কমিশনের সুপারিশগুলো এখনো আইনি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসেনি। এ ছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থার সঙ্কট নিরসনে আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠিত হয় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। রাজনৈতিক প্রতিশোধের বদলে আলোচনাভিত্তিক শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের অঙ্গীকার নিয়ে ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে শপথ নেয় এই সরকার। এক বছর পূর্তিতে সরকার তার ১২টি প্রধান অর্জনের তালিকা প্রকাশ করেছে, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে সংস্কার ও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নির্দেশ করে।
শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা : এক বছর আগেও দেশের রাজনীতি ছিল অস্থিরতার চূড়ায়। সরকার পরিবর্তনের পর সহিংসতা ও দমন-পীড়নের বদলে শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও সংযমের পথে হাঁটায় দেশে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা চলেছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বাজারস্থিতি : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে (প্রায় ৭-৮ শতাংশে)। রফতানি বেড়েছে ৯ শতাংশ, রেমিট্যান্স ছাড়িয়েছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সাথে টাকার মান ডলারের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ : সরকারের প্রবাসীবান্ধব ও বিনিয়োগসহায়ক নীতির ফলে বিদেশী বিনিয়োগে (এফডিআই) বড় অগ্রগতি হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপ বাংলাদেশে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে ২৫ হাজার কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্যনীতি ও ট্যারিফ আলোচনায়ও অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও রূপান্তর কমিশন : ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে ভিত্তি করে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এতে ১১টি গণতান্ত্রিক রূপান্তর কমিশনের কথা বলা হয়েছে, যা সাংবিধানিক সংস্কার, নির্বাচন, বিচারিক স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, কোটা সংস্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুপারিশ প্রণয়ন করছে। নতুন সমাজচুক্তির ভিত্তি স্থাপনে এই কমিশনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
জবাবদিহিমূলক ও নিরপেক্ষ শাসন : প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি নয়, বরং জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সরকার পরিচালিত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা : ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক রক্ষা করছে। একই সাথে সার্ক, বিমসটেক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংগঠনে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের রূপান্তরে অর্থায়ন বৃদ্ধি করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে অধ্যাপক ইউনূসের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রক্ষায় সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা ও পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে জটিল আলোচনা চললেও, পাকিস্তান ও চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মেরুকরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ, ওআইসি, আইএলওসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে সতর্ক আশাবাদ নিয়ে।
রোহিঙ্গা সঙ্কট ও জলবায়ু নীতি : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন ও কার্বন নিরপেক্ষ উন্নয়ন কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহায়তার আওতায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক জাগরণ ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ : সরকার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং পথশিশু, শ্রমজীবী মানুষ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানবিক কল্যাণে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ : তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগের মাঝেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রয়টার্স, এপি, দ্য গার্ডিয়ানসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং বিরোধী দলের প্রতি সরকারি মনোভাব নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের পথ : আন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন রাজনৈতিক আস্থা অর্জন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন। যদিও ‘ব্যালট না ব্যারেল’-এই স্লোগান তুলে সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ সংস্কারের নিশ্চয়তা ছাড়া এখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিচ্ছুক। সুশীলসমাজ ও আন্তর্জাতিক মহলের মতে, বিশ্বাসযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য এখনই রাজনৈতিক সংলাপ, নিরপেক্ষ কমিশন এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এক বছরে বেশ কিছু কাঠামোগত ও আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। তবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে দৃশ্যমান অগ্রগতি না ঘটলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এক কথায়, এই সরকার এখন এক কঠিন মোড়কে দাঁড়িয়ে- যেখানে আস্থা অর্জনের জন্য বাস্তব পদক্ষেপই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে।