
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বেচ্ছাচারিতায় দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ৫৮ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ায় পরিস্থিতিকে উচ্চঝুঁকির দিকে নিয়ে গেছে। দিন দিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিনই শিশুরা মারা যাচ্ছে, নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে (বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল আটটা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৮ জন।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি।
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়ানো, বিশালসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাবলির আলোকে সংস্থাটির গত বৃহস্পতিবার এ মূল্যায়ন করে সংস্থাটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, টিকার ঘাটতি এবং মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার তুলে ধরা হয়। বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি দেশের আগের অর্জনকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয় ২০২৪-২৫ সালে (অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে) দেশে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির কারণে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ বা এমআর১ ও এমআর২ কভারেজ কমে যায়। এ কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৭৩ জনের। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২ হাজার ৩১৮ জন চিকিৎসাধীন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে। দেশের আট বিভাগে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। ১৫ মার্চ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ২৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা গেছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বস্তি এলাকায়। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহী (৩,৭৪৭ জন), চট্টগ্রাম (২,৫১৪ জন) এবং খুলনা বিভাগে (১,৫৬৮ জন) সংক্রমণ তীব্র হচ্ছে।
হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা। আক্রান্ত শিশুদের ৭৯ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স ২ বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবাই টিকা না পাওয়া অথবা আংশিক টিকা পাওয়া (এক ডোজ)। ৯১ শতাংশ রোগী ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি, যা এই বয়সি শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির প্রমাণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। ২০০০ সালে যেখানে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২০ সালের পর থেকে দেশব্যাপী কোনো নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) পালিত না হওয়া এ ঝুঁকির পথ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা এবং ভিটামিন এ-এর ঘাটতি থাকা শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব ও মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন মূল্যায়নের পর সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি বাড়তে থাকায় আমরা বলেছিলাম, হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা হোক। এখন সরকারের উচিত জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা এবং টিকাদান এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক তীব্র ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সব বয়সী মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে অল্প বয়সি শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে হাম এখনো বিবেচিত হয়। এই রোগ বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির নাক, মুখ বা গলা থেকে বের হওয়া ড্রপলেটের মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে।
সংক্রমণের পর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রাথমিক উপসর্গ দেখা যায়। তবে এই সময়সীমা ৭ থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত হতে পারে। উপসর্গের মধ্যে থাকে উচ্চ জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ।
সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। ফুসকুড়ি প্রথমে মাথায় শুরু হয়, এরপর ধীরে ধীরে শরীরের মাঝের অংশ এবং পরে নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে থেকে ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন পর পর্যন্ত একজন রোগী অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে। হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। বেশির ভাগ মানুষ দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে হাম গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে আছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, বিশেষ করে যাদের ভিটামিন এ ঘাটতি আছে এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে এসেছিল।
জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কারণ, একাধিক বিভাগে সংক্রমণ চলমান, বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে, রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি নথিভুক্ত এবং হাম-সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু ঘটেছে।
টিকা না পাওয়া ও আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে এমন শিশুরাও আছে, যাদের বয়স টিকা পাওয়ার জন্য এখনো যথেষ্ট হয়নি। এটি অব্যাহত সংক্রমণ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।