রাশিয়া দাবি করেছে যে তারা ইউক্রেনের বিমান পরিবহন ও প্রতিরক্ষা-শিল্প অবকাঠামোতে একটি বড় নির্ভুল হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান মেরামত ও ড্রোন উৎপাদন স্থাপনা। মস্কো এই হামলাকে ইউক্রেনের করার এবং বিমান অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করার সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে।
শুক্রবার জারি করা এক বিবৃতিতে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ৯ জানুয়ারি এই হামলা চালানো হয়েছিল এবং এর মধ্যে তাদের পরিবহনযোগ্য স্থল-ভিত্তিক ‘ওরেশনিক’ নামের নতুন পরিবহন যোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে লভিভ স্টেট এভিয়েশন রিপেয়ার প্ল্যান্ট ধ্বংস করা হয়েছে, যেখানে ইউক্রেনের এফ-১৬ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো।
লভিভে ইউক্রেনের বিমান রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযানের খবর নয়, এটি ইউক্রেন যুদ্ধের চরিত্র বদলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি কেবল সম্মুখ যুদ্ধের সেনাদের লক্ষ্য করে নয়, বরং যুদ্ধটিকে সচল রাখে এমন শিল্প, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত, যা ইউক্রেনের বিমান মেরামত এবং সম্মুখ যুদ্ধের নিকটবর্তী টেকসই বিমান হামলা বজায় রাখার ইউক্রেনের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, লভিভ স্থাপনা রাশিয়ান সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে গভীর আক্রমণে ব্যবহৃত মাঝারি এবং দূরপাল্লার ড্রোন উৎপাদন ও বিমান প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ, রাশিয়া একইসঙ্গে ইউক্রেনের দুই প্রধান আক্রমণ সক্ষমতা: বিমান ও ড্রোন, লক্ষ্যবস্তু করেছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে রাশিয়া এখন যুদ্ধকে একটি শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর সংঘাত হিসেবে দেখছে, যেখানে সামরিক শিল্প কারখানা ধ্বংস করাই সামরিক সাফল্যের চাবিকাঠি।
কিয়েভে সমান্তরাল হামলায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করাও রাশিয়ার একই কৌশলের অংশ। রাশিয়া জানিয়েছে, এই আক্রমণ কেবল পশ্চিম ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা ইস্কান্দার কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং কালিবার সমুদ্র-চালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কিয়েভে অতিরিক্ত রাতারাতি হামলা চালিয়েছে। কারণ প্রতিরক্ষা শিল্প বিদ্যুৎ ছাড়া অচল।
রাশিয়ার বার্তা পরিষ্কার:
যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, যুদ্ধের পেছনের চালিকাশক্তিতে আঘাত করা হচ্ছে। ইউক্রেন অবশ্য এই হামলায় সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করেনি এবং দেশটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এফ-১৬ সহায়তা অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষতি স্বীকার করেনি। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি উঠছে ন্যাটোর জন্য। এফ-১৬ সরবরাহ করা হয়েছে এই ধারণায় যে এগুলো ইউক্রেনের আকাশে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। কিন্তু যদি এর রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ও সহায়ক শিল্প সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তাহলে সেই সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
লভিভে রাশিয়ার হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পথরেখা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এটি একটি সতর্ক সংকেত যে, এই যুদ্ধ আর কেবল মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি পূর্ণমাত্রার শিল্পযুদ্ধ, যেখানে প্রতিটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও কারখানা জয়ের জন্য একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য। এদিকে, সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি লভিভে হামলাটি কেবল ইউক্রেনের উদ্দেশ্যে নয়; এটি ছিল কিয়েভের পশ্চিমা মিত্রদের জন্য একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা। বিশেষ করে তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর দেশগুলোর প্রতি, যারা ভবিষ্যতে কোনো শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অংশ হিসেবে।
উল্লেখ্য, একাধিক ওয়ারহেড বহনক্ষম ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ৫শ’ থেকে ৫ হাজার ৫শ’ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম। এটি পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এবং ইউরোপের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এবং একটি পারমাণবিক হামলার সমতুল্য ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে সক্ষম। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘ওরেশনিক’ শব্দের গতির ১০ গুণ, অর্থাৎ ম্যাক ১০ বেগে উল্কার মতো ছুটে চলে এবং এটিকে প্রচলিত কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় ধরাশায়ী করা সম্ভব নয়। এই অস্ত্র ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তিন, চার বা তারও বেশি তলা নিচে পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে পারে। তাঁর দাবি, এই অস্ত্রের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা বর্তমানে অসম্ভব।
রাশিয়া প্রথমবার ওরেশনিক ব্যবহার করার পর ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে ছয়টি স্বতন্ত্রভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণযোগ্য ওয়ারহেড ছিল, যার প্রতিটিতে ছয়টি করে সাবমিউনিশন যুক্ত ছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ওয়ারহেড থেকে নিক্ষিপ্ত সাবমিউনিশনগুলোতে বিস্ফোরক ছিল না, তবে সেগুলোর উচ্চ গতিশক্তি এমন ছিল যে তা টনের পর টন বিস্ফোরকের সমতুল্য ধ্বংসক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে। সূত্র: ইউটিউব, কেইটিকে