
মার্কিন চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়বে না ইরান। একই সঙ্গে দেশটির মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও অন্য কোনও দেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে না বলে জানিয়েছেন ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামী।
তিনি বলেছেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা বিধি এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইসলামী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আলোচনার বিষয় হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সমৃদ্ধকরণকে আলাদা করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে এবং বলা হচ্ছে, এটিকে আলোচনার এজেন্ডায় রাখতে হবে। কিন্তু সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইরানের এই শীর্ষ পরমাণু কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পারমাণবিক প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। ফলে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিকে তিনি ‘প্রতারণা ও মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন।
ইসলামী বলেন, “এমনকি আমেরিকারাও তাদের জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক নথিতে পারমাণবিক প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সুতরাং এসব দাবি প্রতারণা ও মিথ্যা।
মার্কিন চাপের মধ্যেই ইরানের অনড় অবস্থান
ইরানের এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিরোধ আবারও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রাখার সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ সহজ করে দিতে পারে।
তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও গবেষণাসহ বেসামরিক প্রয়োজনে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার ইরানের রয়েছে বলেও দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করে আসছেন।
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তাই আলোচনার বিনিময়ে এই সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করা কিংবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বিদেশে হস্তান্তরের দাবি তেহরান মেনে নেবে না।
এনপিটির আওতায় কার্যক্রম পরিচালনার দাবি
ইরান দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। দেশটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির সদস্য হিসেবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে।
তবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, মজুত এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
অন্যদিকে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, নিজেদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে তারা সরে যাবে না।
ফলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন- এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যৎ যেকোনও পারমাণবিক সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন ইস্যু হয়ে থাকবে।
সূত্র: আল-জাজিরা