সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানঃ ফাইল ছবি
ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) বাংকারযুক্ত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে যাতায়াত করছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হুতিদের হামলা তীব্র হওয়ায় ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে জনসমক্ষে খুব কম দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় দিন ধরে যুবরাজকে বিশেষভাবে নির্বাচিত নিরাপত্তাকর্মীদের পাহারায় একাধিক সুরক্ষিত প্রাসাদে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তবে তার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশিত এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
গত শনিবার সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে হামলার ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন রবিবারও বিমানবন্দরটিতে হামলা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন এবং আহত হন আরও ১১ জন।
একের পর এক হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না যুবরাজকেঃ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল মোহাম্মদ বিন সালমানকে। সেদিন তিনি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রক্ত দেন। এরপর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রিয়াদে হামলার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় শহরটির বিভিন্ন স্কুল বন্ধ করে দূরশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গত মাসেই ট্রাম্প সৌদি যুবরাজকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ইয়েমেনে হুতিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে। তবে সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর তার বক্তব্যে উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যা ঘটছে, তা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি বিবেচনা করবেন। এর আগে সৌদি আরব পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
হুতিদের হামলার নিন্দা যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নেরঃ সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং হামলাকে ‘ঘৃণ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা সংঘাতকে বিপজ্জনকভাবে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
স্কাই নিউজকে স্ট্রিটিং বলেন, সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার প্রবণতা বাড়ছে। এ কারণেই সৌদি আরবকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনও হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর এসব হামলা অঞ্চলকে সহিংসতার চক্রে ঠেলে দিচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান তিনি এবং সৌদি আরবের প্রতি ইইউর সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার হুতিদেরঃ রবিবার রাতের হামলার দায় স্বীকার করেছে হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির দাবি, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে চারটি ‘বিশেষ অভিযান’ চালিয়েছে। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাও তাদের লক্ষ্য ছিল বলে জানিয়েছে তারা।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সৌদি বিমানবন্দরগুলো তাদের বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। তিনি সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেন।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ হামলাকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহত পাকিস্তানি নাগরিকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে তারা।
শনিবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ছিলেন। তাদের একজন দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থার একজন ক্যাপ্টেন। এছাড়া নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের দুই নাগরিক, যুক্তরাষ্ট্রের একজন, মিসরের একজন, জর্ডানের একজন, সিরিয়ার একজন, ফিলিস্তিনের একজন, সুদানের একজন এবং ভারতের একজন নাগরিক ছিলেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও শনিবারের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জানান, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। বেসামরিক মানুষের জীবনকে উপেক্ষা করে চালানো এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা দেন তিনি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বিমানবন্দরে হামলাকে বেসামরিক স্থাপনায় ‘কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সংঘাতে জড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রঃ ইয়েমেনে চার বছর ধরে চলা জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর গত জুলাইয়ে গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়। বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মধ্যে এই লড়াই জোরদার হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার কারণে দেশটি প্রতিবেশী ইয়েমেনের সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি আরব আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন তা নাকচ করেছে। তবে ট্রাম্প এবার সরাসরি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, হুতিদের ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফলে রিয়াদে ধারাবাহিক হামলা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ডেইলি মেইল, দ্য সান, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট