ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া নেতৃত্ব দেন গুম-খুনে আয়নাঘরের রূপকার শেখ মামুন খালেদ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : মার্চ ২৭, ২০২৬, ৭:০১ পূর্বাহ্ণ /
ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া নেতৃত্ব দেন গুম-খুনে আয়নাঘরের রূপকার শেখ মামুন খালেদ
  • খালেদা জিয়াকে মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে দেন নেতৃত্ব, ছিলেন ফোনে আড়ি পেতে জিম্মি করার প্রবক্তা; সাংবাদিকদের ডেকে নিয়েও করেন নির্যাতন * জলসিঁড়ি আবাসনের শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে শাস্তির সুপারিশ হলেও পার পেয়ে যান

এক-এগারো এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে গুম-খুনের মাধ্যমে তিনি রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। ফোনে আড়ি পাতা এবং একাধিক জঙ্গি নাটকের প্রবক্তাও বলা হয় এই মামুন খালেদকে।

রাজনীতিকদের ওপর নির্মম নির্যাতন এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়সহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আয়নাঘরের রূপকার এই মামুন খালেদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক ছিলেন। তার সময়কালে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে অসংখ্য মানুষকে আয়নাঘরে আটকে নির্যাতন করা হয়। দেশের অলোচিত অনেক গুমের হোতাও তিনি।

এছাড়া এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন, আওয়ামী লীগের আমলে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ নানা অপকর্মের অন্যতম ক্রীড়নক ছিলেন এই মামুন খালেদ।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গড়ে তোলা জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের জেরে সেনাবাহিনীর কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশও করা হয়।

কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের আস্থাভাজন হওয়ায় সেই শাস্তি থেকেও পার পেয়ে যান। ফাইলটি নথিজাত করা হয়। বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামুন খালেদের আর্থিক দুর্নীতি অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দেন আদালত। তবে এক্ষেত্রেও অজ্ঞাত শক্তির প্রভাবে দুদকের অনুসন্ধান চলে ধীরগতীতে। এখনো তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি।

অনুসন্ধান কবে শেষ হবে বা আদৌ শেষ হবে কি না, তা জানা নেই কারও। এ সুবাদে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজধানীর পল্লবীর ডিওএইচএস-এর নিজস্ব ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটেই নির্বেঘ্নে অবস্থান করেছেন। বিএনপি সরকার গঠনের দেড় মাসের মাথায় বিতর্কিত এই সেনা কর্মকর্তাকে অবশেষে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন ডিওএইচএস-এর ১০৭৯ নম্বর বাসার ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মিরপুর মডেল থানা এলাকায় দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলার তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসাবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে শেখ মামুন খালেদকে।

বৃহস্পতিবার আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, গ্রেফতার মামুন খালেদকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মামলাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিগত সময়ে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এদিকে ডিবির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, সোমবার রাতে গ্রেফতার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সংসদ-সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনা রয়েছে ডিবির। রিমান্ডে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক-এগারোর সরকার এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আমলের অনেক অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শেখ মামুন খালেদ ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই-এর পরিচালক (এফএসআইবি ও সিআইবি) ছিলেন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ফোর্সেস সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (এফএসআইবি) পরিচালক থাকাকালে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে চরম নির্যাতন চালান তিনি। ওই সময় তারেক রহমানকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করার ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও একই পদে বহাল ছিলেন মামুন খালেদ। ২০১১ সালে ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক হন তিনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল অফিসার থেকে এসে ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক হওয়ার বিরল নজির স্থাপন করেন তিনি।

সূত্র বলছে, সেনাবাহিনীর সিগন্যাল অফিসার থেকে পদোন্নতি পেয়ে ডিজিএফআই-এর প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন তিনি। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক ছিলেন মামুন খালেদ।

এ সময়ে ফোনে আড়ি পাতার মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড করে জিম্মি করা এবং বিরুদ্ধ মতের লোকদের তুলে এনে নির্যাতন ও গুমের সূচনা করেন তিনি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সাহারা খাতুনের নির্দেশে রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বরে এক আবাসন ব্যবসায়ীর জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তার হাত দিয়েই সূচনা হয় বহুল সমালোচিত আয়নাঘরের। আওয়ামী লীগ আমলের অলোচিত বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম গুমের সঙ্গেও তৎকালীন ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক মামুন খালেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

২০১০ সালের ২৫ জুন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে গুম হন চৌধুরী আলম। আজও ফেরেননি তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত ৬নং বাড়ি থেকে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে তড়িঘড়ি করে উচ্ছেদের অন্যতম কুশীলব ছিলেন এই মামুন খালেদ। ওই সময় পুরো মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল ডিজিএফআই-এর। ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক থাকাকালে মোবাইল মনিটরিং সেন্টারের মূল দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

দুদকের অনুসন্ধান : ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ ও তার স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদের দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২২ মে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব এ আদেশ দেন। শেখ মামুন খালেদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার আবেদনে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শেয়ার ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে।

তদন্তকালে জানা যায়, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। তাই সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা জরুরি। জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী বৃহস্পতিবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে আছে, মামলা হয়নি।’ অনুসন্ধান শেষ হতে কতদিন লাগতে পারে এবং মামলা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রোববার অফিস খুললে খোঁজ নিয়ে তথ্য দিতে পারব।’

সিনিয়র সাংবাদিকের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা : ভুক্তভোগীদের একজন সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমেদ। বৃহস্পতিবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন, দেশনত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতি কেন অর্গানাইজ করলাম, এটাই ছিল আমার অপরাধ।

বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরে তিনি লেখেন, লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ ব্রিগেডিয়ার হিসাবে ১/১১-র সময় ডিজিএফআই-এর মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে তৎকালীন লে. কর্নেল গোলাম মাওলাকে দিয়ে অমানবিক নির্যাতন করিয়েছিলেন। চৈত্রের তীব্র গরমের মধ্যে একটি আলো-বাতাসহীন দমবন্ধ হওয়ার মতো ঘরে বন্দি করে রাখেন। আমার অপরাধ ছিল দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে গণমাধ্যমে ৭০০ সাংবাদিকের বিবৃতির উদ্যোগ কেন আমি নিয়েছিলাম?

ফেসবুক পোস্টের এক অংশে সৈয়দ আবদাল আহমেদ লেখেন, ‘ডিজিএফআই থেকে আমাকে ডাকা হলো চিফ রিপোর্টারদের সঙ্গে একটি বৈঠকের কথা বলে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। আমার সহকর্মী ও বন্ধু লে. রুশদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাই। রুশদকে বলা হলো কিছুক্ষণ পরে সভা হবে, আপনি থাকার দরকার নেই। তিনি চলে গেলেন। এরপর লে. কর্নেল গোলাম মাওলার অমানবিক নির্যাতনের শিকার হলাম। আমার বাবা একজন আলেমে দ্বীন ছিলেন। মসজিদের একজন খতিব ও পীর সাহেব হিসাবে সারা জীবন আদর্শ জীবনযাপন করেছেন, মানুষের কল্যাণ করে গেছেন। কিন্তু ওই আর্মি অফিসার আমার বাবাকে উদ্দেশ করে, এমন একজন আলেমে দ্বীনকে উদ্দেশ করে যে ভাষায় গালাগাল করেছিলেন, আমার তখন মনে হলো, এর চেয়ে আমার মরণ হলো না কেন? আমি ওই অফিসারকে ‘আমার বাবা একজন আলেম, আমার জন্য ওনাকে কেন গালাগাল করছেন’ বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি, গালি অব্যাহতই রেখেছিলেন। তেমনি সেদিন স্কুল থেকে ছেলেকে বাসায় নেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। কিন্তু ডিজিএফআই-রে অফিসে আটক থাকায় বাসায় বা স্কুলে খবর দিতে পারিনি। ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছুটির কয়েক ঘণ্টা পর ছেলেটিকে বাড়ি পৌঁছায়। অফিস এবং বাসা থেকে আমার খোঁজ শুরু হলে লে. রুশদ ভাই সাংবাদিকদের জানান এবং ডিজিএফআই অফিসে যোগাযোগ করেন। এরই মধ্যে বিষয়টি সাংবাদিকদের মধ্যে জানাজানি হওয়ার পর তারা রাতে প্রেস ক্লাব থেকে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেন, এ খবর পেয়ে ডিজিএফআই রাতে অবশেষে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এত বছর পর আজ সেই মামুন খালেদ তাদের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য ধরা পড়েছেন, খবরটি দেখে খুব ভালো লাগছে। পাপের জন্য কিছুটা হলেও প্রায়শ্চিত্ত করুন মামুন খালেদ।’