
খুলনা বিভাগে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। কোথাও কাক্সিক্ষত শয্যা মিলছে না, আবার কোথাও অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন মানুষ। গত কয়েক দিনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। শুধু সরকারি হাসপাতাল নয়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এখন শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরো বিভাগের মধ্যে খুলনা জেলা সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুর জন্য পৃথক ইউনিট চালু করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে রোগীর পাশাপাশি স্বজনদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে রাত-বিরাতে শয্যার সন্ধানে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো অনেক পরিবারের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে চরম দুর্ভোগের। অন্যদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। শয্যা সংকটের কারণে হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সমগ্র খুলনা বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৬০০ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে শুধু খুলনা জেলাতেই সবচেয়ে বেশি (১,৪০০ জনের বেশি) মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং হাসপাতালগুলোতে শয্যার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ জনের বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ২০২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৬০৪ জন ছাড়িয়েছে। বর্তমানে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৬১৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদিকে বাগেরহাটে ১৪ জন, যশোরে ১৭ জন, ঝিনাইদহে ০ জন, সাতক্ষীরায় ২ জন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন, মাগুরায় ৪ জন, নড়াইলে ১৩ জন, কুষ্টিয়ায় ২ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩ জন এবং মেহেরপুরে ২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেনারেল হাসপাতালসহ প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই সাধারণ ডেঙ্গু শয্যা বা বেড খালি নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেককে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
মশা মারার জন্য সিটি কর্পোরেশন শহরকে ৩টি জোনে ভাগ করে প্রতিদিন দুই বেলা ফগার মেশিন ও লার্ভিসাইড (মশার লার্ভা মারার ওষুধ) ¯েপ্র করছে। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নগরীর সোনাডাঙ্গা, রূপসা ও টুটপাড়া এলাকায় ৩টি বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল খুলনাকে জরুরি ‘ডেঙ্গু মহামারি এলাকা’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির প্রেক্ষিতে খুলনাকে মহামারি এলাকা ঘোষণা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা চালুর দাবি জানিয়েছে মহানগর বিএনপি। গত সোমবার দুপুরে কেডি ঘোষ রোডে আয়োজিত দলের এক জরুরি সভায় নেতারা অভিযোগ করেন যে, সময় মতো কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। গত এক সপ্তাহে আইনজীবী ও একজন গৃহবধূসহ অন্তত সাতজনের মৃত্যুতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও অবকাঠামো না থাকায় সাধারণ রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মশা নিধনে প্রশাসনের ভূমিকা কেবল লোক দেখানো ফগিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন। নিয়মিত লার্ভিসাইড ছিটানো এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে মশা নিধনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ইনকিলাবকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই জানিয়েছে খুলনায় এবার দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ হবে। সরকার এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। আরো ২ থেকে ৩ মাস এই প্রকোপ থাকবে। খুলনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেসিসি ব্যাপক কাজ করছে। নগরবাসীকে সতর্ক করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। লিফলেট প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, খুলনা মেডিকল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। তারা সেখানে কাজ করছে। আক্রান্তের হার বিবেচনা করে চারটি ওয়ার্ডকে রেড, ৫টি ওয়ার্ডকে কমলা ও বাকী ওয়ার্ডগুলোকে হলুদ জোন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড ¯েপ্রর সাহায্যে মশক নিধন শুরু হয়েছে। এছাড়া উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালার মশা মারতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি হুইল ব্যারো ফগার মেশিন (ধোঁয়া দিয়ে মশা মারার যন্ত্র) ব্যবহার করা হচ্ছে।খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক থেকে দুই দিন জ্বর থাকলেও দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।