জনকল্যাণে জিয়ার সেই গ্রাম সরকার আবারও দেখতে চায় দেশের মানুষ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : মার্চ ২৯, ২০২৬, ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ /
জনকল্যাণে জিয়ার সেই গ্রাম সরকার আবারও দেখতে চায় দেশের মানুষ

গ্রাম এখন আর অজপাড়া গ্রাম নেই। গ্রাম-জনপদের মানুষজন অনেক সচেতন। তারা দেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতকে নিয়ে ভাবেন। মন-মগজে আঁকেন নিজেদের মতো করে সুন্দর একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন আর পরিকল্পনা। দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর বসবাস গ্রাম-জনপদে। গ্রামের বেশিরভাগ লোক কৃষিজীবী। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, খামার, প্রবাসী, ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানা, পরিবহন, মৎস্যজীবী, দোকানি, চাকরিজীবী মিলিয়ে বিচিত্র পেশায় তারা কর্মচঞ্চল।

জাতীয় অর্থনীতিতে গ্রামীণ জনগণের বিশাল ভূমিকা ও অবদানের পরিধি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবার ঈদুল ফিতর এবং কদিন বিরতি দিয়ে কাছাকাছি স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটিছাটা যোগ হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহের লম্বা ছুটিতে গ্রাম-জনপদ রূপান্তরিত হয় শহর কিংবা উপশহরে।

কর্ম আর পেশার ব্যবস্থায় যাদের বসবাস শহর-নগরে; প্রায় সবারই নাড়ির টান গ্রামবাংলায়। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্বে আসার পরিপ্রেক্ষিতে টানা ছুটির অবকাশে শহর-নগর-বন্দর ছেড়ে কোটি কোটি শহুরে মানুষ ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় আপন ঠিকানায় ছুটে গেছেন। শহুরে আর গ্রামের মানুষের মেলবন্ধনে গ্রামীণ কোলাহলের গত কিছুদিনের দৃশ্যপট ছিল আনন্দধারায় অভূতপূর্ব।

গ্রাম ও শহর-নগরের মানুষের মিলনমেলায় পরস্পর ভাববিনিময়ের (মিথষ্ক্রিয়া) অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়। গ্রামীণ চা দোকানে আলাপে-আড্ডায় সরগরম হয় গ্রামের সংসদ বা ‘গ্রামের পার্লামেন্ট। সেইসব আড্ডায়-আলোচনায় মূলত উঠে আসে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজচিত্র, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির হালচাল ও প্রবাসীদের নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, গ্রাম-জনপদের অভাব-অভিযোগ ও সমস্যা-সম্ভাবনা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর মূল্যায়ন ইত্যাদি হরেক বিষয়।

আলোচনা-পর্যালোচনায় আরো উঠে এসেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই খালকাটা কর্মসূচি; যা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি উদ্বোধন করলেন। একই সঙ্গে শহীদ জিয়ার গ্রামবাংলার উন্নয়ন ধারণার (কনসেপ্ট) আলোকে সেই ঐতিহাসিক গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার বিষয়টিও জোরালোভাবে তাগিদ এখনও উঠে আসছে গ্রাম-জনপদের সচেতন মানুষজনের আলাপচারিতায়।

শহীদ জিয়ার লক্ষ্যটা ছিল গ্রামের উন্নয়ন ও জনকল্যাণের চাবিকাঠি গ্রামের মানুষের হাতেই তুলে দেয়া। বিশেষ করে গ্রামের প্রবীণদের আকুল প্রত্যাশা, শহীদ জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের হাত ধরে খালকাটা কর্মসূচির মতো গ্রাম সরকার’ যুগোপযোগী করে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে গ্রামের সমস্যা-সঙ্কট, অভাব-অভিযোগ সুরাহা এবং উন্নয়ন ও জনকল্যাণের পথ সুগম হবে। যদিও নতুন প্রজন্মের নাগরিকরা গ্রাম সরকার ধারণার সঙ্গে পরিচিত নয়।

১৯৭৬ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া গ্রাম সরকার’ ধারণা প্রবর্তন করে গ্রামীণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে ক্ষমতার বাস্তব বিকেন্দ্রীকরণ করেন। যাতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরো, বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী করা যায়। এতে গ্রামের সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু গ্রাম সরকার’ ধারণা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের সময় পাননি প্রেসিডেন্ট জিয়া। তার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। গ্রাম সরকারের কার্যক্রমের আওতায় ছিল গ্রাম-জনপদের ছোটখাটো বিরোধ-বিবাদ মীমাংসা, রাস্তাঘাট, খাল, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন কার্যক্রম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা। এসব ক্ষেত্রে মামুলি ছোটখাট সমস্যার জন্য শহর-নগরে অফিসে অফিসে দৌঁড়ে হয়রানি আর পোহাতে হবেনা।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রবর্তিত গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি প্রফেসর মুহম্মদ সিকান্দার খান গতকাল শনিবার বলেন, গ্রাম সরকার একটি ভালো ও কার্যকর ধারণা। সরকার কথাটা বললেই এদেশের বিশেষত গ্রামের মানুষজন নড়েচড়ে বসেন। ‘গ্রাম সরকারকে জনপ্রিয় এবং জনকল্যাণমুখী করলে এটি দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এরজন্য জোরালো প্রচারও প্রয়োজন। গ্রাম সরকার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে। নতুন আঙিকে এখনও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা যায়।

তিনি আরো বলেন, গ্রাম সরকারকে আইনের চোখে ভিত্তি দিতে হবে। পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান করে বাজেট দেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো অফিসার-আমলার মাধ্যমে নয়; গ্রামের মানুষেরা নিজেদের মধ্যে যারা ভালো মানুষ বলেই চেনে-জানে তাদের সরাসরি বাছাই করবেন। ভালো লোকদের দায়িত্ব দিতে হবে। যাতে ঋণখেলাপি বা তীব্র বিতর্কিতরা অন্তত না আসতে পারে। তাহলেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার গ্রাম সরকার ধারণা শক্তিশালী করেই পুনঃপ্রবর্তন করা সম্ভব। এর ফলে গ্রাম-জনপদের জনগণ সহজে পাবেন সেবা, উন্নয়ন, জনকল্যাণ এবং স্থানীয় ছোটখাট বিরোধের সমাধান। ঠিকমতো দায়িত্বটা বুঝিয়ে দিতে পারলেই সুফল আসবে।

একই প্রসঙ্গে একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাম সরকার’ ধারণা ভালো একটি ধারণা (কনসেপ্ট)। গ্রাম সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যাতে গ্রামের মানুষ হাতের নাগালে সেবা ও উন্নয়নের সুফল পেতে সক্ষম হয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং গ্রামবাংলার উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী একটি ধারণার প্রবর্তক এবং পথপ্রদর্শক। যা হচ্ছে জিয়ার ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। স্থানীয় শাসন বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে গ্রাম অবকাঠামোর ছোটখাট উন্নয়ন, সংস্কার এবং প্রত্যন্ত গ্রামান্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে শহীদ জিয়ার বড় ধরনের উদ্যোগ। গ্রাম সরকারের লক্ষ্য ছিলÑ গ্রাম-জনপদ পর্যায়ে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, স্থানীয় সমস্যাবলীর স্থানীয়ভাবে সমাধান, স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন। গ্রাম সরকার মূলত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নিচে বা এর পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে।

যার উদ্দেশ্য শাসন বা ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া, গ্রামবাসীর হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ প্রদান, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত করা, স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি, উন্নয়ন কাজগুলোতে দ্রুততা আনা, রাস্তাঘাট, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার কাজগুলো সহজ করা, স্থানীয় সমস্যা, অভাব-অভিযোগ দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান, স্বনির্ভরতা আনয়ন। গ্রাম সরকার ব্যবস্থায় গ্রামের মানুষ নিজেরাই উন্নয়ন পরিকল্পনা করবে; কমবে বাইরের ওপর নির্ভরতা।

গ্রাম সরকার’ কাঠামো গঠিত হয় একজন প্রধান (গ্রাম প্রধান বা নেতা), কয়েকজন সদস্য (গ্রামের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তি), যারা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ জনগণ। তাদের কাজ একসঙ্গে বসে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো, ছোটখাট বিরোধ নিষ্পত্তি, সামাজিক কাজকর্ম পরিচালনা ইত্যাদি। তাছাড়া রাস্তাঘাট, খাল, জমিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ দেখভাল, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন, শিক্ষা সচেতনতা, গ্রামে শান্তি-সম্প্রীতি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা দান।

‘গ্রাম সরকার’ ধারণা বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তি হিসেবে ১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার পদ্ধতি সংস্কারের অংশ হিসেবে এটি চালু করা হয়। পরবর্তীতে গ্রাম সরকার অধ্যাদেশ (১৯৮০) এর মাধ্যমে আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়। বর্তমানে গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা না থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) গ্রাম আদালত বহাল থাকার মাধ্যমে গ্রাম সরকার আংশিকভাবে আজও চালু রয়েছে।

পরিশেষে এটাও বলতে হয় বিচার ব্যবস্থাকে জনগণের দোর গোড়ায় আনাও আজ সময়ের দাবী।