স্টালিন সরকার
সেদিন ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। কারফিউ উপেক্ষা করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ঢাকার অভিমুখে পদযাত্রা করেন। ঢাকার প্রবেশ পথে নানা বাঁধা উপেক্ষা করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। আওয়ামী লীগের কথিত রাজনৈতিক দুর্গ যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, তীব্র প্রতিরোধে রাজপথে ১৪’শ মানুষকে হত্যা করে মসনদে টিকতে না পেরে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। অবসান ঘটে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের। এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি পায় দেশ।
আজ ৫ আগস্ট সেই ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের দিন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করার পর উল্লাসিত জনতা রাজধানীর রাজপথ দখলে নেয়। তাদের মধ্যে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা শেখ হাসিনার তৎকালীন বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে বিজয় উদ্যাপন করা শুরু করে। গণভবনের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ গণভবন ও জাতীয় সংসদেও প্রবেশ করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থী সবাই রাজপথে নেমে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন উদ্যাপন করে। সে এক ভিন্ন দৃশ্য। দুই বছর পর ঘুরে এসেছে সেই ৫ আগস্ট দ্বিতীয় বিজয় দিন। দিবসটিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন। সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিত-সংস্কৃতির সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠন দিবসনে যথাযোগ্য মর্যাদায় নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করবেন।
এ বিজয় অর্জনে হাজারো শহীদ, ২৩ হাজারেরও বেশি আহত, সাত শতাধিক মানুষ দৃষ্টিহারা, হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ববরণ, হাজারো সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শিক্ষার্থীর কারাবরণ, নির্যাতন-নিপীড়নের অবর্ণনীয় ত্যাগ রয়েছে এ অর্জনে। রয়েছে প্রিয়জন, স্বজন এবং সন্তান হারানোর করুণ আর্তনাদ। ৫ আগস্ট এখন আর ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ তারিখ নয়। জাতির গুরুত্বপূর্ণ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মতোই ৫ আগস্ট দিবসটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪শ শহীদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর জুলাই সদন রচিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষরও করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এখন ক্ষমতায়। তারপরও ভারতের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্করা এখনো হাসিনা কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মধ্যে বিরোধ করলেও ‘হাসিনা পুনর্বাসের ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ মোকাবিলায় সবাই একাট্ট।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে প্রত্যাশায় কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল, সে প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে কি দেশ এগিয়ে চলছে? স্বৈরাচার হাসিনার পালানোর পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পেরেছে। নতুন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা দিল্লিতে বসে হুংকার ছাড়ছে। দিল্লি বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চাপের মুখে রাখতে ‘শেখ হাসিনা কার্ড’ খেলছে। আর দেশের এক শ্রেণির গণমাধ্যম ও ব্যাক্তি মানবতাবিরোধী অপরাখে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত শেখ হাসিনার হুংকার নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করছেন। এমন ভাবে প্রচারণা চলছে যে দেশের মানুষ যেন শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মুখিয়ে রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্রেন দিয়েও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যাবে না। অথচ পলাতক হাসিনা জুলাই অভ্যুত্থানের দিনও যেন সর্বত্রই উপস্থিত!
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেশে কি ঘটেছিল? ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালে দেখা যায়,বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলন ঠেকাতে শেখ হাসিনা পৈচাসিকতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। পথে প্রান্তরে আইনশৃংখলা বাহিনীর জুলুম নির্যাতন, পৈশাচিক হত্যাকান্ড, সংঘাত-সংঘর্ষ, জরুরি অবস্থা জারি, হাসিনার অলিগার্ক আমলা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের তাণ্ডবলীলা ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছিল। সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে আন্দোলন ঠেকাতে টাকা খরচ করেছিল। শেখ হাসিনার নির্দেশে র্যাব-পুলিশ-বিজিবি-সেনাবাহিনীসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনীর অস্ত্রবাজিতে রাজধানী ঢাকার রাজপথ হয়ে উঠেছিল ইসরাইলি বাহিনীর গাজা আক্রমনের মতোই। সেসব ভয়াবহ চিত্র তথা ছবিসহ খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। দেশের কিছু গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের ওই সব ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার চিত্র প্রচার করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ গণমাধ্যম ফ্যাসিস্ট হাসিনার অলিগার্ক হওয়ায় এবং আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেয়ায় গণমাধ্যমে সে খবর পুরোপুরি প্রচারের বদলে কাঁটছাঁট করে প্রচার করে। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয় এমন খবর প্রচার করা থেকে বিরত থাকে। কোনো কোনো গণমাধ্যম আন্দোলনের বিরুদ্ধে সুকৌশলে খবর প্রচার করে। আবার কোনো কোনো গণমাধ্যম কর্পোরেট হাউজের হওয়ায় ভয়ভীতি ও আতঙ্কের কারণে আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রকাশ করেনি।
২০২৪ সালের মূলত জুলাই-আগস্টে রাজধানীতে চলা ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে শেখ হাসিনার নির্দেশে নির্বিচারে প্রাণঘাতী গুলি চালিয়েছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। আন্দোলনের শুরু থেকেই প্রাণঘাতী বুলেটের ব্যবহার হয়েছে বলে সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে। ঢাকার কয়েকটি স্থানে ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে অন্তত ১২৪০টি প্রাণঘাতী গুলির তথ্য মিলেছে সরকারি নথিতে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিনিধি দলও তাদের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। সরকারের দেয়া তথ্য উপাত্ত বলছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ২০২৪ সালের পহেলা জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৯৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। এসব ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দিনরাত ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপকহারে দমনপীড়ন চালায়। সরকারি নথি ঘেঁটে দেখা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১২৪০ রাউন্ড ৭.৬২ ক্যালিবার চায়না রাইফেল দিয়ে গুলি ছোড়ে বিজিবি ও আনসার সদস্যরা। ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের বিচার শাখা থেকে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো একটি গোপন প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় উপরে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়। এমনকি স্নাইপার ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চায়না রাইফেলের গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভাঙ্গা হাত-পা নিয়ে অনেকেই সুচিকিৎসার দাবিতে একাধিকবার রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিলেন। সরকারি খরচে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসা নিতে সিংগপুর ও থাইল্যান্ড নেয়া হয়েছিল। গুলিতে কয়েকশ ছাত্র-জনতা ও নিম্নআয়ের পেশাজীবী হাত-পা হারিয়েছে। মূলত ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বর্তমানে দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর নির্দেশে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সরকারের একাধিক অধিদপ্তর, পরিদপ্তরে কাজ করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সরকারের চাহিদামতো দ্রুত সময়ে আন্দোলন দমন করতে রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, এয়ারপোর্ট, মোহাম্মদপুর, ধানম-ি, মিরপুর, শাহবাগ ও কাওরান বাজার, ফার্ম গেইট, মহাখালি, বাড্ডা, মিরপুর, শনির আখড়া, রায়েরবাগ, গুলিস্তান, চানখাঁর পুল এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে কেউ কেউ তার কমান্ডিংয়ে থাকা বিজিবি ও আনসার সদস্যদের ছাত্র-জনতার ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র এসএমজি দিয়ে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অজুহাত দেখিয়ে শান্তিশৃংখলা রক্ষায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানী ঢাকায় সেনাবাহিনী নামানো হয়। অতঃপর পর্যায় ক্রমে সারাদেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে সরকার কারফিউ জারি করে। ২৮ জুলাই থেকে মঙ্গলবার ৩০ জুলাই সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। তবে আগস্ট মাসের শুরুতেই কাফ্যু করাকরি করা হয়।
রাজধানী ঢাকা যখন অগ্নিগর্ভ, পথে পথে রক্তের দাগ ও হাসপাতালগুলোতে লাশের সরি, তখন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন সমর্থন করে মিছিল বের করে। ৪ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পক্ষে মহাখালী ডিওএইচএসে রাওয়া ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছাত্রজনতা যখন রাজপথ দখলে নিয়েছে তখন আন্দোলন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার যখন মরিয়া হয়ে উঠে। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন। তখন বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরিস্থিতি এতোই উত্তপ্ত এবং সরকারের বাহিনীগুলো খুনের নেশা এতোই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে যে ঘরে ঘরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে থাকে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনতে বাধ্য হয়।
ওই দিন কার্ফু ছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জনতা রাস্তায় নেমে আসায় ঢাকা ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। অথচ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃংখলা বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারছে। এর মধ্যেই লাশের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে চানখারপুল এলাকায় তৎকালীন রমনা জোনের অতিরিক্ত-উপ পুলিশ কমিশনার আখতার হোসেনের সরাসরি নির্দেশে পুলিশকে গুলি চালান। ওই দিন পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী শহীদ হয়। আহত হয় শত শত ছাত্র-জনতা। পুলিশের গুলি করে মানুষ মারার দৃশ্যের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই এলাকার আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে নিশানা করে গুলি করছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কয়েকজন সদস্য। এর মধ্যে এপিবিএন-১৩ সদস্য কনস্টেবল সুজন ছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, সুজন কখনো দাঁড়িয়ে কখনো উবু হয়ে কখনো দুই হাঁটুতে ভর করে কখনো চিৎ হয়ে গুলি ছুঁড়ছে ছাত্র-জনতার উপর। অবশ্য ওই ঘটনার হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচার করে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ভারতের নাচের পুতুল শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনে হত্যাান্ডে এতোই বেপারোয়া হয়ে উঠেন যে তিনি সেনা-র্যাব-পুলিশ বাহিনীর শীর্ষদের স্পষ্ট করে জানান, তিনি লাশ চান। ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ভারতীয় গোয়েন্দারা সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে দেয়া হয়। বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসিনাকে প্রস্তাব দেন রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করার। হাসিনা বেঁকে বসেন। দম্ভোক্তি করে হাসিনা বলেন, ‘কোনো গ্রেফতার নয়, যাকে যেখানে পাবে গুলি করে হত্যা করো’। অভ্যুত্থান আন্দোলনে পুলিশ হত্যাকান্ডের একটি ভিডিও পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করা সম্পর্কে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো.আছাদুজ্জামান খান কামালকে (বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক) জানাচ্ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্য ইকবাল। মন্ত্রীকে একটি ভিডিও দেখিয়ে ইকবাল বলছিলেন, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করলে মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না; পাশের জন দ্বাড়িয়ে যায়। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’
২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনসহ হাসিনার ১৫ বছর ৮ মাসের শাসনামলের নেপথ্যে ছিল ভারতের চানক্যনীতি। ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ভারত নানাভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। ইউনূসকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে হাসিনাকে ফেরানোর চেস্টা করে ব্যর্থ হয়। এই মধ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ ৪৫৭ পৃষ্ঠার কপি প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও ভারতের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে মাঝে মাঝে শেখ হাসিনাকে দিয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। সেটা ভারতের গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করছে। এবারও ৫ আগস্ট সামনে রেখে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন এমন খবর ভারতের গণমাধ্যমে প্রচারের পর সে খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়। শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করা আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তারপরও কিছু কিছু গণমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচার করছে।
শেখ হসিনা দেশে ফিরবেন এমন বার্তা প্রচার করে বাংলাদেশে অস্থিতিশীল সৃষ্টির চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ থেকে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। প্রধানমনন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ঢাকায় কর্মরত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাকত শেখ হাসিনার এ ধরণের বক্তব্য দিল্লি থেকে প্রচারের ব্যবস্থা করা হলে দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে’। বাংলাদেশের কড়া বার্তার পর ভারত দায়সারা বক্তব্য দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ব্যাপারে ভারত সরকারের হাত নেই। এটি একটি ‘বেসরকারি গণমাধ্যম সংস্থার’ আয়োজিত অনুষ্ঠান এবং সেখানে কোনো ধরনের মতামত ব্যক্ত করা হলে তার দায় ভারতের নয় কিংবা ভারত তা সমর্থন করে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, কেউ যেন শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে খবর প্রচার না করে সে ব্যাপারে গণমাধ্যমকে সতর্ক করবে বাংলাদেশ সরকার। শেখ হাসিনা যখন বক্তব্য দিচ্ছেন, এর আগের বারও আমরা একটা ব্রিফিং দিয়েছি, পত্রিকাগুলোকে একটা নির্দেশনা দিয়েছি। শেখ হাসিনার নিউজ যদি কেউ দিয়ে থাকে, কালকে করবে- এটা যদি কেউ আগাম জানায়, পাবলিশ করে, এটা অবশ্যই আদালতের রায় ভায়োলেট হবে। আমরা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবো। তবে কেউ যদি সংক্ষুব্ধ হয় যে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া ভুল হচ্ছে, প্রচারিত হতে দেওয়া উচিত কেউ যদি মনে করেন- তিনি কিন্তু আদালতে যেতে পারেন। সরকারের কাজ হচ্ছে আদালতের যে সিদ্ধান্ত সেটা এক্সিকিউট হচ্ছে কিনা। সে ব্যাপারে সে ব্যবস্থা নেবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হচ্ছে; শেখ হাসিনার বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে আওয়ামী লীগ এখন ডেডহর্স। বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ঘৃর্ণা করে। তারপরও হাসিনাকে তুরুপের তাস বানিয়ে নরেন্দ্র মোদীদের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি।