
জ্বালানি তেলের যন্ত্রণায় ধুঁকছে মানুষ। ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী ইরান নিয়ন্ত্রণ করায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়। এ সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশে। আগামী দুই মাস জ্বালানির অভাব হবে নাÑ সরকার দাবি করলেও জ্বালানির জন্য হাহাকার চলছে। গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে।
এ সংকটে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্থবির হয়ে পড়ছে নগর জীবনের গতি। জ্বালানি নিয়ে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে এবং কয়েকটি দেশ থেকে জ্বালানি আনা হয়েছে, এমন প্রচারণা থাকলেও গ্রাহক জ্বালানি পাচ্ছেন না এটিই বাস্তবতা। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার দুই মাস যেতে না যেতেই জ্বালানি সংকট প্রশাসন যন্ত্রকে কার্যত বিব্রতকর অবস্থায়। জ্বালানির দায়িত্বে যারা রয়েছেন সেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে বক্তব্য দিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপত্র গতকালও সংবাদ সম্মেলন করে জ্বালানি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে নেই কোনো সমন্বয় এবং অনেকটা একই কুমির ছানাকে বারবার দেখানোর মতোই বক্তব্য দিচ্ছেন। ভুক্তোভোগীরাও সেটি বিশ্বাস করতে পারছেন না। গতকালও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি প্লাস (এজেডইসি) অনলাইন সামিটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছেন।
জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা এবং কার্ডপ্রথা চালু করলেও সুফল তেমন আসেনি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী দাবি করেন, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ দিয়ে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। ডিজেলের ক্ষেত্রেও মে মাসে পর্যন্ত সমস্যা দেখছেন না। দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন, ফার্নেস তেল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ তেল দেয়া হতো, এখনো তাই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় বেশি কিনছে। বিজয় সরণির ট্রাস্ট পাম্পে আগে ৫০ থেকে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন দেয়া হলেও গত মঙ্গলবার দেয়া হয়েছে ৮০ হাজার লিটারের বেশি। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযানের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ২০৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৯ হাজার ১১৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে তিন হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে এক কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ৪৫ জনকে কারাদ- দেয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে মানুষের মধ্যে হাহাকার এবং সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দায়িত্বশীল মন্ত্রী-আমলারা কাজির গরু কেতাবের হিসাব নিয়েই রয়েছেন। বর্তমানে জ্বালানি সংকট কার্যত বৈশ্বিক সংকট। এ সংকট মোকাবিলা ও উত্তরণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং জ্বালানি সংকট উত্তরণে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অথচ নতুন নির্বাচিত সরকার এখনো গণবিচ্ছিন্ন আমলাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছেন।
কয়েক সাপ্তাহ থেকে রাজধানী ঢাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের প্রচ- ভিড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি ক্রয় করতে পারছেন না ক্রেতারা। এমনকি জ্বালানির জন্য সারারাত পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। গত কয়েক দিন বাইকের সারি দীর্ঘ দেখা গেলেও গতকাল প্রাইভেটকারের সারি দেখা গেছে। ঢাকার প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কেউ আগের রাত থেকে, কেউ ভোর থেকে, আবার কেউ সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবুও তেল পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
জ্বালানি তেল বিতরণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি ইউনিক কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পে স্ক্যান করে তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে। ফুয়েল পাসধারী মোটরসাইকেল আরোহীরা সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার জ্বালানি তেল নিতে পারছেন। তবে সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।
আরামবাগের বাসিন্দা মজিবুর রহমান ঢালি ভোরে ফজরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে তেল নিতে বের হন। মতিঝিলের একটি পাম্পে পৌঁছানোর আগেই দেখেন লাইনের শেষ প্রান্ত আধা-কিলোমিটার পর্যন্ত চলে গেছে।
ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সরবরাহই শুরু হয়নি। পরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে তেল দেয়া শুরু হলে তখনো তিনি লাইনে অপেক্ষমাণ ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভোরে বের হয়েছিলাম কাজে যাব বলে; কিন্তু দুপুরেও যেতে পারব কি-না জানি না। সব কিছুই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।’
টিকাটুলি, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, ধোলাইরপাড়, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, ঢাকা কলেজ, শাহবাগ, ফার্মগেইট, উত্তরা এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক সড়ক আংশিক দখল হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে শনির আখড়ার বাসিন্দা মাইনুল হোসেন খান বলেন, ‘গতকাল কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। এখন আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রচ- রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’
ঢাকা-গাজীপুর রুটের ভিআইপি পরিবহনের বাসচালক চাঁন মিয়া নীলক্ষেত মোড়ে বাস রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে তেল দেয়া শুরু হবে বলেছে। তাই সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি। সবসময় বাস চালাতে পারি না, তাই আয়ও কমে গেছে।’
ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সচালকরা জানান, তেল সংকটে তারা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে দূরের পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসেরও সংকট দেখা দিচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরো জটিল করছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল বুধবার সচিবালয়ের তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বলেছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সংকট এতটাই বড় যে, এর বোঝা সবাইকে ভাগ করে নিতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি প্রথমে কমানো হয়েছে, শুধু সরকারি খাত নয়, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে।সরকারি ব্যয় সঙ্কোচন নীতি প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, মন্ত্রীদের জ্বালানি বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটেছে। এর প্রভাবে দেশে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বর্তমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক চাপ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহনও আটকে পড়ছে সড়কে তীব্র যানজট, গরমে অসুস্থতা এবং ভোগান্তি চরমে উঠছে। রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি সংকটে জনজীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে। মিলকারখানায় উৎপাদন কমবে। পরিবহন খাতের ধীরগতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জনভোগান্তি আরো বাড়বে এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরো গভীর হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। এখন জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া একটি বড় উপায় যার মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসতে পারে। জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই।’ সরকারের উচিত চলমান এই সংকটে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। অবৈধভাবে মজুদ করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার কিছু অবৈধ ব্যবসায়ী আছে। এ ধরনের লোকজন সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গতকাল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, কাঁচামালের অভাবে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসলেও শোধনাগারটি এখনো সীমিত উৎপাদনে চালু আছে। সরকার সূচি অনুযায়ী পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করছে এবং নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জ্বালানি তেলের সংকটের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সুরাহা করতে না পারায় জামায়াত, এনসিপি, সিপিবিসহ রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, এনার্জিতে (জ্বালানি তেল) এখন হাহাকার। তেল আছে শুধু সংসদে, বাংলাদেশে নেই। সংসদে যখন দায়িত্বশীল মন্ত্রী কোনো বিবৃতি দেন অথবা সরকারি দলের ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে কেউ কথা বলেন, তখন মনে হয় যে, তেলের ওপর বাংলাদেশ ভাসছে।
গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার লাইনে দাঁড়িয়েও মানুষ তেল পাচ্ছে না। কিন্তু কালোবাজারে আড়াই-তিনগুণ বেশি দামে সেই তেল বিক্রি হচ্ছে। তবে মাঝে মধ্যে কিছু লোকদেখানো অভিযান চালানো হচ্ছে। সিন্ডিকেটের খুঁটির জোরে এসব হচ্ছে।’