প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত পদক্ষেপের সুফল আসছে, বিদ্যুতের কমছে লোডশেডিং, বাড়ছে উৎপাদন, সমুদ্র বন্দরে ভিড়ছে তেলবাহী জাহাজ
জ্বালানি সংকট নিয়ে গত কয়েকদিন দেশে ভয়াবহ ‘নাটক’ হয়ে গেল। পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। দায়িত্বশীলদের বেখেয়ালি কথাবার্তা এবং আমলাদের সমন্বয়হীন বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় বট বাহিনীর প্রচারণা দুর্বিসহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তবে সরকার অসৎ মজুতদারদের খাচায় হানা দিয়ে বিপুল পরিমান জ্বালানি উদ্ধার করে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর কময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত কিছৃু উদ্যোগ গ্রহণ করায় কেটে যাচ্ছে জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট। ইতোমধ্যেই কমতে শুরু করেছে লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়তে শুরু করেছে।
দেশে যে জ্বালানি সংকট সৃস্টি করা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি ছিল অপপ্রচার এবং গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গৃহীত পরিকল্পিত, পদক্ষেপ ও কৌশল গ্রহণে ঝুঁকি কমে জ্বালানি ক্রাইসিস কেটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে তথা দ্রুত পদক্ষেপের সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ।
প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী পদক্ষেপ ছাড়াও বৃষ্টি ডিজেল ও বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়েছে। জ্বালানি নিয়ে জাহাজ এখন চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড় করছে। গতকাল রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এটা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগে নতুন বার্তা।
বাংলাদেশ পারমানবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রবেশ করায় পাওয়ার সেক্টরে নতুন দরজা খুলে গেল। বিদ্যুৎ সংকট এবং গ্রাহক চাহিদামতো সরবরাহ করতে না পারায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে গেছে। এখন সে বকেয়া বিল আদায়ও বেড়ে যাবে। রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ সেক্টরের খড়া ধীরে ধীরে কেটে যাবে।
দেশে বিদ্যুৎ-গ্যাস-সংকট আগে থেকেই ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার গত দুই মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কিছুটা সংকট কেটে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পারমাণবিক শক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল হওয়া ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বা সম্মতিপত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন ক্ষমতা আছে ৬ হাজার মেগাওয়াট। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। এটি মূলত সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
শিল্পখাতে বিনিয়োগ সহজ করতে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিতা দিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ও সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করা। পরিকল্পনায় অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জ,রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পর্যালোচনা,স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার বিএনপি’র ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগছে না। জ্বালানিসংকট, বকেয়া বিল ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে উৎপাদন কমেছে চারটি বড় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রেও।
ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শুক্র-শনি) চাহিদা কমলেও লোডশেডিং কমেনি। বৃষ্টি না হলে আরও কয়েক দিন লোডশেডিংয় থাকতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের দুই মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট।
কিন্তু কয়েক দিন ধরে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। যদিও দিনের অধিকাংশ সময় উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় মূলত গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ৪৩ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। এ ছাড়া ২২ শতাংশ কয়লাভিত্তিক ও ১৯ শতাংশ ফার্নেস তেলভিত্তিককয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাসের পর কয়লা থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাই কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সব তৈরি রাখা উচিত ছিল।
এ ছাড়া তেলচালিত কেন্দ্রও বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। এসব কেন্দ্র যত বেশি চালানো হবে, তত বেশি ভর্তুকি বাড়বে সরকারের। এ কারণে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চায় না মন্ত্রণালয়।
বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেশ এখন বাংলাদেশ। আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। গত এক সপ্তাহ ধরে অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কারণে সারা দেশে তেলের সঙ্কট অনেক কমেছে।
চাহিদার ৮০ শতাংশ পেট্রোল এবং অকটেন দেশে উৎপাদন হয়। জ্বালানি পণ্য নিয়ে সরকারের চিন্তা কম। সাগরে ট্যাঙ্কার ভর্তি ডিজেল অলস পড়ে রয়েছে। জ্বালানি তেল খালাসে বিপিসির এমন উদাসীনতার রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বিপিসির তেল খালাসের কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একসঙ্গে বেশি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা সম্ভব হয় না।
এরপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে ডলফিন জেটির তিনটিতেই তেল খালাস চলছে। গ্রীষ্ম ও শুষ্ক মৌসুমে বৈশাখের তীব্র তাপদাহ বৃষ্টির কারণে কমে গেছে। গত ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে সরকার বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বা সমন্বয় কার্যকর করে। তাতে ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি আগের একশ’ টাকা থেকে ১৫ টাকাবাড়িয়ে ১১৫ টাকায় ধার্য্য হয়েছে।
বাড়তি দামেও ডিজেল না পাওয়ায় লাইটারেজ জাহাজসহ নৌপথে পণ্য পরিবহন বিঘিœত হচ্ছে। বিপিসির যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত দেশে ২৬টি জাহাজে আট লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন ডিজেল আমদানি হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে।
আবার কয়লা সংকট কেটে যাচ্ছে। দেশে অনেক আমদানি করা কয়লা পড়ে আছে। আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার কারণে শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎতের চাপ কমেগেছে। শিল্পকারখানা গুলোতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কেটে যাচ্ছে।