১৯৯১ সালের পর দেশের নির্বাচিত সরকার প্রধানের ছবি ছাড়া অন্য কারো ছবি সরকারি দফতরে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা নেই। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনার তার শাসনামলে নির্বাচিত সরকার প্রধান হিসেবে নিজের ছবি সরকারি দফতর এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে টানিয়ে রাখার বিধান করেন। পরে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ মর্যাদা দিয়ে তার ছবিও নিজ ছবির পাশে টানাতে আইন করেন। বর্তমান কিংবা সাবেক প্রেসিডেন্টের ছবি টানিয়ে রাখার কোনো বিধান নেই।
এ হিসেবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবিও কোনো দূতাবাসে থাকার কথা নয়। তা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রেসিডেন্টের ছবি নামিয়ে ফেলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মর্মে গুঞ্জন ছড়ানো হয়। গত দু’দিন ধরে দূতাবাসগুলো থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মর্মে প্রচার করা হচ্ছে। যার ছবিই টানানো নেই তার ছবি নামানোরও প্রশ্ন ওঠে না। প্রকৃতপক্ষে সংবিধানের ‘৪ক অনুচ্ছেদ’র বিভ্রান্তিকর ব্যখ্যা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয় এ প্রপাগান্ডা।
পঞ্চদশ সংশোধনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, ২০১১ সালে হাসিনার সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘জাতির পিতা; বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের একটি উপ-অনুচ্ছেদ যুক্ত করে। ওই অনুচ্ছেদে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দূতাবাস ও মিশনে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়। সংবিধানে সংজ্ঞায় ‘জাতির পিতা’ বলতে শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝানো হয়েছে।
হাসিনার বিতাড়িত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন দফতর থেকে শেখ মুজিবুরের ছবি নামিয়ে ফেলার মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়। এতে দু’য়েকটি সরকারি দফতর ব্যতীত সব দফতর নিজ উদ্যোগে ছবি নামিয়ে ফেলে। ছবি নামানোর বিষয়ে সরকারি কোনো আদেশ ছিল না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই নিজ দফতরে শেখ মুজিবের ছবি টানিয়ে রাখছেন। এর প্রমাণ মেলে পিরোজপুর নেছারাবাদ উপজেলা সোনারঘোপ রমেশ চন্দ্র সরকারি প্রথামিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামিমা ইয়াছমিনের অফিসকক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ঝুলিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে।
বিষয়টিকে ঘিরে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে। পরে শামিমা ইয়াসমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। শামিমার যুক্তি হচ্ছে, সংবিধানে এখনো ‘জাতির জনক’র ছবি টানিয়ে রাখার বিধান অক্ষত রাখা হয়েছে। শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি নামিয়ে ফেলার কোনো অফিস আদেশ তিনি পাননি। এ ঘটনায় টনক নড়ে সরকারের। পরে শামিমা ইয়াসমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ব্যাপকভাবে আলোচিত এ ঘটনার পর বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ‘প্রেসিডেন্ট’র ছবি নামিয়ে ফেলার মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।
কোন ছবি নামাতে বলা হয়েছে সেটি উল্লেখ ছিল না নির্দেশনায়। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেলিফোনে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে! ছবি যেখানে টানানোই ছিল না সেখানে নামিয়ে ফেলার তথ্য অবাস্তব। অথচ এই ‘ছবি নামানো’কে প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের পূর্বাভাস বলে প্রচার করছে কয়েকটি চিহ্নিত মিডিয়া। গুজব-গুঞ্জনে মাতোয়ারা এসব মিডিয়া কোন পক্ষের হয়ে কাজ করছে সেই প্রশ্ন উঠছে বারবার।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা তার ছবি সঙ্গে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিদেশে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি মিশনে টানিয়ে রাখা হয়েছিলো। এসব মিশনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কোনো ছবি নেই। রাষ্ট্রাচার অনুসারে সেটি থাকার কথাও নয়। তথাপি বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে তার ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে মর্মে প্রচারণা চলছে।
পররাষ্ট্র দফতর সূত্র বলছে, টেলিফোনের নির্দেশনায় কোন প্রেসিডেন্টের ছবি সরাতে হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। যদিও এই ‘প্রেসিডেন্ট’ বলতে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির কথা বলা হয়। গত শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কয়েকটি মিশনে টেলিফোনে এই নির্দেশ দেয়া হয় বলে জানা যায়। গতকাল রোববার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, আসলে এ খবরটি সঠিক নয়। সরকারিভাবে কোনো সময় প্রেসিডেন্টের ছবি টানানো ছিল না। এখনো নেই।
গত শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত কয়েকজন রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারকে ফোন করেন। ঢাকা থেকে বিদেশে বাংলাদেশের নির্ধারিত কয়েকজন কূটনীতিককে নিজেদের মিশন থেকে যেকোনো ছবি সরিয়ে নিতে ফোনে নির্দেশনা দেয়া হয়। অন্য মিশন, উপমিশন থেকে ছবি সরানোর জন্য অন্যদের জানাতেও নির্দেশনা দেয়া হয়। অথচ কোন কর্মকর্তা ফোনকলটি করেছে তার নাম-পরিচয় কিছুই প্রকাশ করা হচ্ছে না। যা আরো রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৮২টি মিশন ও উপ-মিশন রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫টির বেশি মিশন ও উপমিশন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে ফেলতে বলা হয় গত বছর। ওয়াশিংটন, দিল্লি, বেইজিংসহ বেশির ভাগ মিশন থেকে মুজিবুর রহমানের ছবি নামিয়ে ফেলেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এসব ছবি নামানো হয়। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো দূতাবাস এ নির্দেশনা তামিল করেনি।
এদিকে প্রেসিডেন্টের ছবি নামিয়ে ফেলার গুজবের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় প্রেসিডেন্টের দফতর বঙ্গভবনে। সেখানকার সূত্রগুলো জানায়, বিদেশে অবস্থিত কোনো দূতাবাস থেকে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার কোনো দালিলিক তথ্য প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের সচিব খান মোহাম্মদ নূরুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাতে তার কোনো বক্তব্য মেলেনি।
প্রসঙ্গ, জুলাই-অভ্যুত্থানের পর নানা সময়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানোর চেষ্টা করা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যমান সংবিধানে প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এ ছাড়া তিনি প্রধান বিচারপতি এবং অন্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেন। যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যত প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা খুব একটা না থাকলেও সরকারের দৈনন্দিন কার্যপরিচালনায় সহযোগিতা করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। যেমন জরুরি অবস্থা ঘোষণা, সংসদ স্থগিত করা, যুদ্ধ ঘোষণা প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারভুক্ত। সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যা দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও পদোন্নতি দেন তিনি। প্রয়োজনে অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনেরও ক্ষমতা রাখেন।
আইনজ্ঞদের মতে, সাংবিধানিক এ পদ থেকে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানো হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। বিদ্যমান সংবিধান অনুসারে সেই পদ পূরণের আপাত কোনো সুযোগ নেই। কারণ সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। ফলে স্পিকারকে প্রেসিডেন্টক পদে বসানো যাচ্ছে না। ডেপুটি স্পিকার হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি। প্রেসিডেন্টের শূন্যপদ পূরণে যথাক্রমে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারকে দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণের বিধানই সংবিধানে রয়েছে। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ক’দিন পর পর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানোর ধুয়া তোলা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, যা সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠীর পরিচালিত সুপরিকল্পিত প্রপাগান্ডা।
বাংলাদেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুবিধা হয় স্বার্থান্বেষী মহলের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি করা গেলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এমন দুরভিসন্ধি থেকে ক’দিন পরপরই বাজারে ছাড়া হচ্ছে ‘সাহাবুদ্দিন-মাইনাস’ গুজব। আইনজ্ঞরা মনে করেন, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার কথিত যে টেলিফোন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মর্মে প্রচারিত হচ্ছে এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় রহস্যজনকভাবে নীরব। এ প্রপাগান্ডার বিপরীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় কোনো ব্যাখ্যা-বিবৃতি অদ্যাবধি দেয়া হয়নি। ফলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করে নির্বাচন পেছানোসহ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ওঁৎপেতে থাকা সরকারের উচ্চভিলাষী একটি অংশের ইন্ধন রয়েছে মর্মে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আপনার মতামত লিখুন :