কথায় বলে ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। অর্থাৎ সকাল দেখেই সারাদিন কেমন যাবে তা বোঝা যায়। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের শুরুটা ঠিক তেমনই ইঙ্গিত করছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে এমনটি অনেকে মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল সচিবালয়ে অফিস করছেন। তার আগমনে দ্বিতীয় দিনেই সচিবালয়ে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র, ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য।
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত বছর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশের মাটিতে পা রেখেই বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। তার আগমন উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে বিশাল গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিনের সেই বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাতে ছিল পরিবর্তনের আভাস। এক নতুন দিনের, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার প্রত্যয়। তার সে বক্তব্য ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত। যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের জুলুম নির্যাতনে তিনি দেশছাড়া হয়েছিলেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জেল খাটতে হয়েছে। জেলে থেকে বিনা চিকিৎসায় যিনি গুরুতর অসুস্থ হয়েছেন। তার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চলেছে। অথচ দেশে ফিরে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না কোনো প্রতিহিংসামূলক কথা। তিনি শুধু দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তার সে বক্তব্যে দেশবাসী মুগ্ধ হয়েছে। সবার মনে তখন এক নতুন দিনের নতুন যাত্রার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সে প্রত্যাশা অনুযায়ী তারেক রহমান তার যাত্রা শুরু করেছেন এমনটা বলা যায়। দেশে আসার পর বিমানবন্দরে তার জন্য রাখা হয়েছিল বুলেটপ্রুফ গাড়ি। কিন্তু তিনি সেটি ব্যবহার না করে তার নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে একটি বাসে চড়ে জনগণের কাছে গেলেন। এরপর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। সেখানেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তার সভামঞ্চে কোনো ডায়াস নেই। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মঞ্চের এ মাথা থেকে সে মাথা হেঁটে হেঁটে তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি সাধারণ মানুষকে মঞ্চে ডেকে এনে তাদের সাথে কথা বলেছেন। রাস্তায় যাওয়ার সময় তার প্রটোকল উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের কাছে গেছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে তার সুনিপুণ প্রচারণায় সারাদেশে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরো ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয় অর্জন করেছে।
বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উন্মুক্ত স্থানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যাত্রা। প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পর থেকে নিয়ম অনুযায়ী তাকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মধ্যে চলতে হবে। প্রটোকল মানেই কড়াকড়ি নিরাপত্তা, সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা করা আর সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা। কিন্তু প্রচলিত এই ভিআইপি প্রটোকল নিচ্ছেন না তারেক রহমান। ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে তিনি জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করতে চান না। শপথের পর প্রথম দিনই দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখা গেছে প্রটোকলের কঠোরতা ছাড়াই জনসাধারণের সঙ্গে মিশে চলাচল করতে। যেন ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো গণতান্ত্রিক দেশের দৃশ্য। সাধারণ মানুষ তার এসব কর্মকা-ে বেশ খুশি।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সচিবালয়ে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর রাজধানীর এক ব্যস্ত মোড়ে যানজটে আটকে পড়ে। প্রত্যাশা ছিল, মুহূর্তেই রাস্তা ফাঁকা করে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অন্য সব গাড়ির মতোই সিগন্যালে অপেক্ষা করছে প্রধানমন্ত্রীর বহর। কোথাও অতিরিক্ত তৎপরতা নেই, নেই হর্ন বা সাইরেনের চাপ। গাড়ির কাচ নামিয়ে পথচারীদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। অনেকেই বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ান, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ আবার এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই দৃশ্য, যা নিয়ে শুরু হয় ইতিবাচক আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব কেবল কিছু আচরণগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রতীকী বার্তা। নেতৃত্ব জনগণের ঊর্ধ্বে নয়, বরং জনগণের অংশ। এমন পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
গতকাল দ্বিতীয় দিন সচিবালয়ে তিনি ব্যস্ত সময় পার করেছেন। সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও যমুনার মেরামতের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী অফিস করবেন। এ অবস্থায় সচিবালয় থেকেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কর্মপরিকল্পনা শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সকালেই সচিবালয়ে প্রবেশ করার পর প্রথম বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেন। এতে আসন্ন ঈদের আগেই দুস্থ-গরিব মহিলাদের মাধ্যমে কার্ড বিতরণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং ৫ বছরের মধ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, নদী-খাল খনন এবং জলাধার পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এ ছাড়া তিনি প্রতিরক্ষা বিষয়ে তিন বাহিনীর প্রধানদের সাথে বৈঠক করেন।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অফিসে বসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করছেন। তিনি নিজে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি যাচাই করছেন এবং কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। এছাড়াও তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সচিবালয়ে এই দুই দিনের কার্যক্রম দেশের প্রশাসনিক কর্মকা- ও উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তদারকিতে বিভিন্ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে ।