
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সৃষ্টি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দেশজুড়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে দেশের ১৪টি জাতীয় সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সংগঠন।
সেইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্ণাঢ্য উৎসব, আবৃত্তি, আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজনের দাবি জানিয়েছে তারা।
বুধবার (৩ জুন) বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠকরা বলেন, ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ কবিতাটির মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার চেতনা তুলে ধরেছেন জাতীয় কবি।
তার সেই চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯২৬ সালে রচিত নজরুলের ঐতিহাসিক সৃষ্টি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কেবল একটি কবিতা বা গান নয়, বরং জাতির সংকটকালে পথনির্দেশনা দেওয়া এক অনন্য চেতনার প্রতীক। সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাতীয় ঐক্যের যে শক্তিশালী বার্তা এতে নিহিত রয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শতবর্ষ পূর্তির প্রাক্কালে এই কালজয়ী সৃষ্টির অন্তর্নিহিত মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে একটি মানবিক, সম্প্রীতিময় ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নজরুলের এই সাম্য ও ঐক্যের বাণী নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান সময়ে দেশে-বিদেশে ধর্মীয় বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজন এবং সহিংসতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার বিপরীতে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত মানবতার এক উজ্জ্বল দিশারী। বিশেষ করে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্মিলিত সংগ্রামের চেতনা জাগ্রত করতে সক্ষম।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নজরুল তার সাহিত্য, সংগীত ও কর্মের মাধ্যমে আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানবিক পরিচয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার রচনায় বারবার উঠে এসেছে সকল ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের আহ্বান। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়া সময়ের দাবি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, জাতীয় জীবনের নানা সংকট ও বিভাজনের মুহূর্তে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
সমাজে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে গানটির বার্তা ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর শতবর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশনা, আবৃত্তি উৎসব এবং তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নজরুলের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে জাতীয় জীবনে আরও গভীরভাবে চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ নজরুলসংগীত সংস্থা, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাংস্কৃতিক ঐক্য জোট, আলোকধারা (নারায়ণগঞ্জ), বস্তুনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক একাডেমি (নারায়ণগঞ্জ), কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরসহ দেশের ১৪টি সংগঠন।
নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় কবির এই কালজয়ী সৃষ্টির শতবর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে সমাজে মানবতা, সম্প্রীতি ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ আরও বেগবান হবে।