
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতির চিত্র। এখনো প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি; বেকারত্ব দূরীকরণও সম্ভব হয়নি। তবে ইতোমধ্যেই অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে দেশ। উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ। কলকারখানায় উৎপাদনে বিদ্যুৎ চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন করতে বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যাপকভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যত দেশের আগামীতে হতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির রোডম্যাপ।
১৩ মে একনেক সভায় ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মধুমতি-ইছামতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-বড়াল, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়ালসহ ১৯ জেলার নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়বে ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার হবে, কৃষিতে বিপ্লব ঘটবে।
চীনের অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেজিংয়ে নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে এবং দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ করে নদীকে স্থিতিশীল করা হবে।
এর ফলে বন্যা এবং ভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমবে। স্যাটেলাইট শহর হবে নদী তীরে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮০৯ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে এক হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫ দশমিক ০১ শতাংশ। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির চিত্র।
পদ্মা ব্যারাজ : পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। চলতি বছরের জুলাই থেকে এই ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পে কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০৩৩ সালের জুন মাসে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদীব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদীব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনঃখনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
এতে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধান হবে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদী পুনরুজ্জীবিত হবে, যার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততার নিরসন হবে। এতে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং কৃষি ও মাছের উৎপাদন বাড়বে।
রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলার হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতিসহ প্রধান নদীব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার হবে।
দেশের প্রধান নদীব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততার আগ্রাসন হ্রাস, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে। বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে প্রধান নদীগুলোর প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ জল পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়বে। এছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন এবং নগরায়নেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ইনকিলাবকে বলেন, বিগত ষাটের দশক থেকে ফারাক্কা প্রবাহে শুষ্ক মৌসুমে পানি কমতির দিকে। এপ্রিল-মে মাসে পানি একেবারে কমে যায়। পানিপ্রবাহ না থাকায় ২৪টি জেলার কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এসব জেলায় ৭ কোটি মানুষের জীবিকার ক্ষতি হয়, নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।
২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের বিশেষজ্ঞদের স্টাডি করার নির্দেশনা দেন। ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত স্টাডি পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বিগত নির্বাচনের আগে তারেক রহমান নির্বাচিত হলে পিতা-মাতার পথ ধরে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।
অতঃপর সরকার গঠনের পর বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠকের পর রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। গত ১৩ মে একনেক সভায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত অনুমোদন হয়।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে ২৪ জেলার মানুষ উপকারভোগী হবে। পদ্মার সঙ্গে সংযোগ নদীগুলোতে নাব্যতা বাড়বে। বিশাল ওই এলাকার কৃষি-মৎস্য সেক্টরে সুফল আসবে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে সুন্দরবনে ইকো সিস্টেমে ভারসাম্য আসবে, ২৯শ’ মিলিয়ন ঘনফুট পানি রিজার্ভ করে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে দেয়া হবে।
পদ্মা ব্যারাজকে কেন্দ্র করে ৭টি স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলা হবে। এটা হবে উন্নয়নের মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প। প্রতি বছর বাজেটে পদ্মা ব্যারাজের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি করে টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে।
সৌরবিদ্যুৎ : সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী জুনের মধ্যেই নতুন নীতিমালা করা হবে। এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব ঘটবে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বর্তমান সরকারি সংস্থার জমিতে পিপিপি ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন গাইডলাইন অনুমোদন করা হয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ আইন)-এর আওতায় অনুমোদিত ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করে। এই প্রকল্পগুলো নিয়ে এখন পুনর্মূল্যায়নের কথা বলা হচ্ছে।
চীন বাংলাদেশে সৌর প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থাপন এবং বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বাংলাদেশে সৌর প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থাপন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে চীনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ।
সৌর প্যানেল তৈরির বিশ্বব্যাপী সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি চীনের দখলে। ফলে বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করলে বিদ্যুৎ সেক্টরে বিপ্লব ঘটে যাবে।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ইনকিলাবকে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ মেট্রোসিটিগুলোর বড় বড় বিল্ডিংয়ের রুপটপে সোলার প্যানেল লাগাবো।
সরকারি অফিসের সব বড় বড় বিল্ডিংয়ে সোলার প্যানেল লাগানো হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আরো ৫ হাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে।
তিস্তা মহাপ্রকল্প : এ মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তিস্তা নদীকে একটি বিধ্বংসী ও অস্থির নদী থেকে স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে। চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অনেক আগেই।
বিগত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও দিল্লির অনুগত আমলারা নানা অজুহাতে ফাইল লালফিতায় বন্দি করে রাখে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
বর্তমান সরকার সে উদ্যোগ দ্রুত অগ্রগতির চেষ্টা চালাচ্ছে। চীনও চায় তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হোক। কিন্তু মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের ২ কোটি মানুষ সুবিধা পাবে। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল দিকগুলোর মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ। ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেজিং (নদী খনন) মাধ্যমে তিস্তা নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে এবং দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ করে নদীকে স্থিতিশীল করা হবে।
এর ফলে বন্যা এবং ভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমবে। ভারত ২০১১ সাল থেকে তিস্তা চুক্তি ঝুলিয়ে রেখেছে। তিস্তার উজানে গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ায় শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা মরুভূমির মতো হয়ে যায়, পানির অভাবে চাষাবাদে ব্যাঘাত ঘটে।
বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেয়ায় তিস্তার আশপাশ এলাকাগুলো বন্যার পানিতে ভেসে যায়। পানি সরে যাওয়ার সময় নদীর দু’পাড়ে ব্যাপক ভাঙন ঘটে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি ও সেচব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে।
শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে জলাধার নির্মাণ করা হবে, যা সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করবে এবং কৃষি উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। কৃষির উন্নতি ঘটলে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসবে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
কর্মসংস্থান ও নগরায়ন হবে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর করতে জলাধার নির্মাণ করা হবে, যা সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করবে এবং কৃষি উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।