আলহাজ্ব মোঃ রবিউল হোসেন
ফুলের রাজধানী নামে খ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি। মূলতঃ গদখালি, পানিসারা, হাড়িয়া এই তিন গ্রাম মিলে নানা শ্রেনির ফুলের চাষ। দেখা দেখি পার্শ্ববর্তী আরও পাঁচ-দশ গ্রাম মিলেও এখন এর ব্যাপ্তি। পানিসারার বেশির ভাগ জমিই বেলে অংশ; এলাকায় এসকল বেশি কিছু জমিতে পূর্বে তুলাচাষ করা হতো। কিছুটা অনুর্বও বেলে ভূমিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে ফুলচাষ করে অনেক কৃষকরাই এখন সমৃদ্ধ। পানি সারা গ্রামের সেরালি সরদারই ফুলচাষের প্রথম উদ্যোগতাও ফুলচাষি।
যশোর-বেনাপোল গামী প্রধান পাকা সড়কের গদখালি মোড় থেকে পানিসারা গামী পাকা সড়ক ও হাড়িয়া গ্রাম মোড় ব্যাপী সড়কের দুধারে বিচিত্র ধরনের বিচিত্র ফুলের প্রদর্শনী প্লট থেকে খুচরা ফুল বিক্রি ও কেনাকটার ভিড়ে মনে হয় কোনটা রেখে কোনটা কিনি? অসংখ্য ক্রেতার মনে কিযে বিশ্বয়কর আনন্দনুভ’তি! দশ টাকার টিকিট কেটে প্রদর্শনী প্লট থেকে শিশু, কিশোর, অভিভাক ও অভিভাবিকাদেরও সেলফিতে ফটোতোলার আকর্ষণে অনেকেই যেন মনে করেন গদখালির ফুলবনে এসে ধন্য হলো বুঝি জীবন। এরই মাঝের পাকা রাস্তার এক পার্শ্বে শিশু কিশোরদের মন মজানো আনন্দ মেলায় অল্পপরি সরে ট্রেন ভ্রমন, ডিজটাল নৌকার দোল খেয়ে নাগর দোলায় উঠবার আকাঙ্খা।
এসবই মার্জিত ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা। ডানে বামে মসজিদ ধর্মীয় চর্চায়ও বাধা নেই কোনো। পাকা রাস্তার দু ধারে বিচিত্র মুখরোচক খাদ্য খাবার, ছোলাভাজা, বাদাম ভাজা, পিয়াজু ভাজা, পাপর, কট-কটি ভাজা, পুরির সিংহড়া ভাজা, ফোস্কা, আছে মাঝারি, উন্নত মানের হোটেলে। সাদা ভাত, পোলাওয়া বিরওয়ানী ভাতের ব্যবস্থ সবই সহজ লভ্য গদখালি ফুলের রাজধানীর এই রেডিমেট বাজারে। চারি দিকে ঘুরে ফিরে ঘর্মাক্ত দেহমনের ক্লান্তি নিবারনে অনেকেরই মনচায় খাইনা একটা চকবার কিনে? শিশু, কিশোর বয়বৃদ্ধ বৃদ্ধা সবাই মিলে খাচ্ছোও তাই। মৌমাছিদের ন্যায় দেশ বিদেশের কতশত পর্যাটক যে ফুলের বনে মাঠে মাঠে ঘুওে বেড়ায় মধু সংগ্রাহের নেশায় নয়, বরং দেশি বিদেশি নানা ধরনের ফুলের রং ও সুবাস ঘ্রানের মন মাতানো আশায়, যা ভাষায় বর্ণনাতীত।
এখানে নেই কানো জুয়াখেলার আসর, নেই কোন অশালীন কর্ম তৎপরতা। শৃংখলা বজায় রাখতে আছে পুলিশ প্রহারা, আছে প্রশাসনের নজরদারি। প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বিদেশি পর্যটকদের আগমনে প্রটোকল রক্ষায় মাঝে মধ্যে ছুটে আসেন যশারের জেলা প্রশাসক, ঝিকরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউ.পি চেয়ারম্যান, আরও কত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। গদখালি বৃহত্তর কৃষি প্রজেক্ট সুরক্ষায় স্থানীয় ফুলচাষী কৃষকদের পরামর্শ বিচিত্র ধরনের পর্যটকদের চাষ বাস সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব ও সমস্যা সমাধানে আছেন কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি ভাবগ কর্তৃক কৃষি প্রদর্শনী প্লট। প্রদর্শনী প্লটে একটা বাড়ি একটা খামার, বালাই নিধন, উকপারি পোকা সংরক্ষণ আদর্শ পরিবার গঠন, উন্নত বীজ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নির্শনসহ বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তিতে কৃষি কাজ করার ব্যবহারিক উদাহরণ।
গদখালি এখন শুধু ফুলের রাজধানীই নয়, এখানে এলে দেহমনের আনন্দ নুভূতি। বিচিত্র জ্ঞান সঞ্চয় এর অপূর্ব স্থান এই গদখালি। গদখালি ফুলচাষ ঘিরে এলাকার শত শত ফুল চাষিরা ফুল চাষও করে যেমন অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধি, তেমনি চাষবাস ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রনে, হাজার হাজার বেকার মানুষদের কর্মসংস্থানের উৎস। ফুল বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বছরে কোটি কোটি টাকা অর্জন স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায় থেকেও গদখালি গ্রাম হয়েও ফুলের রাজধানী গদখালির নাম এখনতো আন্তর্জাতিক পর্যায় বিখ্যাত। একসময় আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ড্যান মেজেনা এই ফুলের রাজধানী গদখালির ফুল বনে আসায় খ্যাতির শীর্ষ পর্যায়ও পৌছেছিল বটে।
ফুলের রাজধানীতে একবার এসে সকল সৌন্দর্য উপভোগ করা যেমন অসম্ভব তেমনি জানা বোঝার বহু অতৃপ্তি নিয়ে সংক্ষিপ্ত সময় শেষে বিদায় জানাতে হয় । সুযোগ হলে আবারও দেখতে বা উপভোগ করতে আসব পবিত্র স্থান ফুলের রাজধানী- গদখালির এই সুন্দর মনমাতানো পরিবেশে। ভালোবাসা দিবস ও পহেলা ফাল্গুন একদিনে পড়ায় গদখালিতে ফুলের পাইকারি হাটে গত পাঁচ দিনে (০৯ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) প্রায় ২৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হওয়ার খবর জানা গেছে যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমিতির পক্ষ থেকে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেচ ও পরিবহন খরচ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বীজ কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচও। যেকারণে ফুলের রাজধানী গদখালীতেও ফুলের মুল্য বেড়েছে এবছর বেশ কিছুটা বেশি।
তারপরও এরই মধ্যে রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে ৪০ লক্ষ গোলাপ। ১২ ফেব্রুয়ারি এক একেকটি গোলাপ বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত। তবে তার পর থেকে বিক্রি হযেছে প্রতি পিস ১০ থেকে ১২ টাকা বা ১৫ টাকায়। গত পাঁচ দিনে গদখালি থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ পিস গোলাপ কিনেছে দেশের বিভিন্নস্থানের ফুল ব্যবসায়ীরা যার মুল্য ৫ কোটি টাকা। ফলে এখানকার ফুল উৎপাদকরা এ বছর ফুলের যথাযথ মূল্য পেয়ে সবাই কমবেশি খুশী বলে বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা গেছে।
আলহাজ্ব মোঃ রবিউল হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট