প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’ ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের সব কার্যক্রমের সাফল্যের ওপরেই সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সফলতা বহুলাংশে নির্ভরশীল।’
গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রাজস্ব সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও এনবিআর এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ বর্তমানে এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে করদাতারা এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।
দক্ষ এবং টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জন-আস্থা অর্জন সম্ভব জানিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেটি আপনাদের বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে, করদাতাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব আপনাদের অবশ্যই নিতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামো জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।’ তারেক রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও মুক্ত থাকতে পারেনি। নীতি-নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ মনোভাব ও রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা করে এনবিআরকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা বিনষ্টের অন্যতম কারণ ছিল এই বিষয়গুলো। বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। একের পর এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যবসায় নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে। নানা রকম চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কর বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসেছে পরিবর্তন। পরিবর্তিত বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যা, সম্ভাবনা, সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেশন, ট্রেড ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এই সবগুলো বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকাটা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক। নিয়মিত করদাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে একটি প্রযোজ্য বিষয় হলো, আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য শুধু বেশি কর আদায় নয়। বরং বেশিসংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। একজন করদাতা যিনি নিম্ন কর আদায় করছেন রাষ্ট্র যেমন তাঁকে সম্মানিত করবে, একইভাবে যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহার করছেন তাঁকেও কর প্রদানের জন্য যথাযথভাবে আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন।
কর ব্যবস্থাপনা কিংবা আদায় পদ্ধতি সহজ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাতে মানুষ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কর দেয়, কর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একই করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি খুব টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের যথাযথ নিয়মে করের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা বা কার্যক্রম উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এজন্য ডিজিটালি আধুনিক ডেটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তারেক রহমান বলেন, ভ্যাট আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। তবে ভ্যাট ব্যবস্থাপনার সফলতা নির্ভর করে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসাবাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা ট্যাক্স আদায় শুধু জোর করার বিষয় নয় বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়। তাই দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এনবিআরকে এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে ভয় নয় বরং বিশ্বাস করে।
উপস্থিত রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি দেশের স্বার্থে আপনারা এনবিআরকে জনগণের কাছে আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সক্ষম হবেন। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান তথা সবার আগে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘সরকার চায় সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। প্রত্যেকটি মানুষের অবদানকে সম্মানের সঙ্গে দেখতে চায় সরকার। সমস্যা আছে, থাকবে। আমরা আলোচনা করে ধীরে ধীরে সমাধান বের করার চেষ্টা করব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারের দায়িত্বে থাকা আপনারা নিরাপদে স্বস্তি নিয়ে দেশ গঠনে কাজ করুন। সরকারের অবস্থান থেকে আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব দেশের স্বার্থে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে প্রাধান্য দিতে।’ তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত সময়টিতে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ছিল ইতিবাচক।
এটি প্রমাণ করে আপনারা (রাজস্ব কর্কর্তারা) পারবেন। অবশ্যই পারবেন ইনশাল্লাহ। আমাদের সবার প্রয়োজন দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা। আসুন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তুলি।’ এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের শুরু হয়। এর পর চলে রাজস্ব আদায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা। এতে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী এনবিআরের প্রদর্শিত স্টলের ডিজিটাল স্ক্রিনে বিভিন্ন উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন।