
প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ। এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। মহানবী (সা.) অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সমন্বয়ে যে সমাজব্যবস্থা, পারস্পরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আমাদের জাতীয় জীবনেও শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তা অনুসরণীয়। সেই দৃষ্টান্তকে পাথেয় করেই আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবেন, সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন এবং ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি।
গতকাল মঙ্গরবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সিরাতুন্নবী (সা.) শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) এমপি, অনুষ্ঠানের বিশেষ ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার এমপি এবং বিশেষ অতিথি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বায়তুল মুকাররম মসজিদের খতিব, দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামা ও পীর- মাশায়েখরা উপস্থিত। প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংযোজন করেন। তিনি ৪টি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর শাসনামলে ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার কার্যক্রমও শুরু হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন এবং ২০০১ সালে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মসজিদ, ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সমাজে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা বৃদ্ধি, তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিম ও খাদেম সাহেবদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবাদানকারীদেরও সম্মানী ভাতা প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে। আমি আশা করি, ২০৩০ সালের আগে প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের সকল মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপসানালয় মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আসবে। ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত সময়। এই মহতী ও পবিত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি জানাই অগণিত সালাম ও দরুদ । একই সঙ্গে ইসলামের সকল নবী ও রাসূল, নবী (সা)- এর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, সকল মুমিন-মুসলমানের রুহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।
মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর আগমন ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। আপনারা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পথপ্রদর্শক। মসজিদের মিম্বর থেকে আপনারা কোটি মানুষের কাছে সত্য, ন্যায়, সততা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেন। তাই সমাজ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতা দূর করতে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করবো, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও নবী করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শ তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে আপনারা অনুপ্রাণিত করবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিভেদ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না।
অতীতের কর্তৃত্ববাদ, ফ্যাসিবাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুসরণ করে, এবং ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি আবারো সবাইকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা বিশেষ করে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী সংস্কৃতি, গবেষণা, প্রকাশনা, মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমার বিশ্বাস, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ ধরনের কর্মসূচি ইসলামের শান্তি, সৌহার্দ ও মানবকল্যাণের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।