

বাংলাদেশে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মূলধারার গণ মাধ্যম গুলোতে বাংলাদেশবিরোধী এক নজিরবিহীন ও পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার ঢেউ শুরু হয়েছে। টানা প্রায় দেড় বছর ধরে চলা এই অপপ্রচার সম্প্রতি আরও জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত, বিকৃত এবং সম্পূর্ণ মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করে প্রতিবেশী দেশটিতে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ ছড়াতে ও মুসলিম নিধনে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের অবিরাম উস্কানি দিয়ে চলেছে হিন্দুস্তানি গণমাধ্যমগুলি।
এক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের যে কারোর ওপর যে কোনো ধরনের হামলাকেই ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা’ হিসেবে প্রচার করে ভারতের জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে ব্যাপকভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশটির গণমাধ্যমগুলো। একারণে সম্প্রতি দেশটিতে ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ ট্যাগ দিয়ে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হচ্ছে। ওড়িষা, বিহার, আসাম সহ বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম শ্রমিকদের দিনেদুপুরে পাশবিকভাবে পিটিয়ে হত্যা করছে চরমপন্থী হিন্দুরা। নজিরবিহীন তাণ্ডবের মুখে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে এসব রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছে পরিযায়ী মুসলিম শ্রমিকরা। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেই ভয়াবহ এই চিত্র উঠে এসেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের শরীয়তপুরের ডামুড্যায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে আহত হয় ওষুধ ব্যবসায়ী খোকন দাস। ভুক্তভোগী হামলাকারীদের চিনে ফেলায় তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয় সন্ত্রাসীরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ৭টার দিকে মারা গেছেন এই ব্যবসায়ী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তার মৃত্যু হয়। সর্বশেষ এই ঘটনাকে ‘হিন্দু নিধন’ হিসেবে ব্যাপকভাবে অপপ্রচার করছে ভারতীয় গুজববাজ মিডিয়াগুলো।
এরআগে, রাজবাড়ী জেলায় চাঁদাবাজির সময় উত্তেজিত জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে এক হিন্দু ব্যক্তি নিহত হয়। এই ঘটনায়ও অযাচিতভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত। পাল্টা জবাব দেয় ঢাকাও। অপরাধমূলক ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে ব্যাপক মিথ্যাচার চালিয়ে খেপিয়ে তোলা হয় ভারতীয় হিন্দু জঙ্গিদের। ফলে তারা এতটাই ভয়াবহ হিংস্র হয়ে পড়েছে যে, ভারতজুড়ে বাংলাভাষী কোনো মুসলিম হিন্দু চরমপন্থীতের সামনে পড়লেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হতাহত করার ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক সপ্তাহে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
এদিকে, রাজবাড়ীর পাংশায় সংঘটিত দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয় বলে এক বিবৃতিতে জানায় অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। এই ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক হামলা নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।২৫ ডিসেম্বর রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো বিবৃতিতে রাজবাড়িতে গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। পুলিশের তথ্য ও প্রাথমিক তদন্ত থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ঘটনাটি মোটেই সাম্প্রদায়িক হামলা নয়। এটি চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত সহিংস পরিস্থিতির থেকে সৃষ্ট ঘটনা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট চাঁদা দাবির উদ্দেশ্যে এলাকায় উপস্থিত হন এবং বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে প্রাণ হারান। তিনি ইতিপূর্বে ২০২৩ সালে রুজুকৃত হত্যা এবং চাঁদাবাজির মামলাসহ একাধিক গুরুতর মামলার আসামি ছিলেন। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল হতে সম্রাটের সহযোগী সেলিমকে একটি বিদেশী পিস্তল ও ১টি পাইপগানসহ আটক করে। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে।
এদিকে, দেশের অন্যতম স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেক সংস্থা ‘রিউমার স্ক্যানার’-এর এক প্রতিবেদনে ভারতীয় গণমাধ্যমের এই ভয়াবহ অপপ্রচারের পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুনি হাসিনার পতনের গত ১২ আগস্ট থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪৯টি ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ নিয়ে ১৩টি সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন খবর প্রচার করেছিল।
বাংলাদেশ ও মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ‘রিপাবলিক বাংলা’, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, জি নিউজ এবং লাইভ মিন্ট, ইন্ডিয়া টুডে, এবিপি আনন্দ, নিউজ১৮ ও আজ তকসহ কয়েক ডজন হিন্দুস্তানি মিডিয়া।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক হামলা ও অপরাধমূলক ঘটনাগুলোকেও ভারতীয় মিডিয়া ঢালাওভাবে ‘হিন্দু নিধন’ হিসেবে প্রচার করেছে। সেসময় ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি ছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ি।ব্যক্তিগত বিরোধ বা রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত কিছু মৃত্যুকে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
ভারতীয় মিডিয়াগুলো জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পুরোনো এবং অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও ব্যবহার করছে। সম্প্রতি প্রথম আলো ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা হিন্দুদের বাড়িঘর হিসেবে প্রচার করতে দেখা গেছে দেশটির প্রথমসারির কয়েকটি গণমাধ্যমকে। এরআগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই মুসলিম পক্ষের (বিরামপুর ও সাদেকপুর গ্রাম) সংঘর্ষের ভিডিওকে ‘হিন্দুদের ওপর হামলা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজবাড়ীতে এক মুসলিম ব্যক্তিকে জুতার মালা পরানোর ভিডিওকে ‘হিন্দু শিক্ষককে অপমান’ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্যকে বাংলাদেশের মন্দিরে হামলা হিসেবে প্রচার করার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রিপাবলিক বাংলার সিনিয়র এডিটর ময়ূখ রঞ্জন ঘোষসহ বেশ কিছু সাংবাদিকের নাম উঠে এসেছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনবরত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণ তৈরি করাই এই অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় গণমাধ্যমের এসব পরিসংখ্যানকে ‘বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত’ বলে বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’-এর মতে, সহিংসতার যে সংখ্যা ভারতীয় মিডিয়া দাবি করছে, বাস্তব সংখ্যা তার চেয়ে অনেক কম এবং তার সিংহভাগই ছিল ৫-৮ আগস্টের অরাজক পরিস্থিতির অংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারতীয় মিডিয়ার এই তুফান বেগে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার কেবল বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে না, বরং ভারতে বসবাসরত মুসলিমদের বিরুদ্ধেও উস্কানি হিসেবে কাজ করছে। এই ‘তথ্য সন্ত্রাস’ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মহলে লবিং এবং নিয়মিত ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্ট প্রকাশের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন :