২০২২ সালের একটি নির্মম গণপিটুনি মামলায় ১৪ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের সাম্প্রদায়িক হুমকি ও অনলাইন হেনস্থার শিকার হয়েছেন দেশটির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর চলমান পুলিশি নিরাপত্তা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত একটি চলমান মামলার শুনানির সময় বিচারপতি বিবেক আগরওয়াল এবং বিচারপতি অবনীন্দ্র কুমার সিং-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে স্বতঃপ্রণোদিত আমল নেন। আদালত বিচারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে পুলিশ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য তলব করেছেন।
গত ১২ জুন বিচারক তাবাসসুম খান মধ্যপ্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্রে গবাদি পশু পরিবহনের সময় ট্রাক চালক শেখ লালা নাজির আহমেদকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৪ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। বরখার গ্রামে সংঘটিত ওই ঘটনার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন যে, আসামিরা ভুক্তভোগীকে আক্রমণ করার সাধারণ উদ্দেশ্যে একটি বেআইনি জমায়েত গড়ে তুলেছিল।
এই ঐতিহাসিক রায়ের পর, নিজেদের 'গো-রক্ষক' দাবি করা বেশ কিছু সংগঠন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, বিচারকের কুশপুতুল দাহ করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণায় মেতে ওঠে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি বিচারক তাবাসসুম খানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর ও গালিগালাজপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছেন এবং আগামী ১০ দিনের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি না দিলে রাজ্যজুড়ে সহিংসতার হুমকি দিচ্ছেন।
বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গুরুতর আখ্যা দিয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। বেঞ্চ তাঁদের পর্যবেক্ষণে বলেন, "আমরা মনে করি যে এই ধরণের কার্যকলাপ আমাদের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের স্বাধীনতা এবং নির্ভীকভাবে কাজ করার পরিবেশকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।"
আদালত আরও জোর দিয়ে বলেন যে, বিচার বিভাগীয় যেকোনো সিদ্ধান্তকে কেবল আপিল বা রিভিশন পিটিশনের মতো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "সমাজের একটি বিশেষ অংশ বা গোষ্ঠীর আদালতের রায় পছন্দ হয়নি বলেই একজন বিচারককে এভাবে হুমকি দেওয়া যেতে পারে না।"
অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, নর্মদাপুরমের পুলিশ সুপার (এসপি) কর্তৃক বিচারক তাবাসসুম খানকে ইতিমধ্যে যে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে তা কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। একই সাথে হুমকি দেওয়ার পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা হলফনামা আকারে জমা দিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুনানি চলাকালীন ডেপুটি অ্যাডভোকেট জেনারেল অভিজিৎ অবস্তী আদালতকে জানান যে, এই ঘটনায় ইতিমধ্যে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। সিওনি মালওয়া পুলিশ আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলোর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে এবং হুমকিমূলক ভিডিওর পেছনের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় কী স্থায়ী নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, তা বিস্তারিত জানিয়ে রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) এবং অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকে (স্বরাষ্ট্র) ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করতে হবে।
এই ঘটনাটি স্পর্শকাতর ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী বিচারকদের নিরাপত্তা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর অনলাইন ভীতি প্রদর্শনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে।