শ্রেষ্ঠতম মহামানবএকসময় পবিত্র জনপদ মদিনা মুনাওয়ারা ‘ইয়াসরিব’ নামে পরিচিত ছিল। মরুপ্রান্তরের একটি সাধারণ নগরী হিসেবেই এর পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু যখন আল্লাহতায়ালা একে রহমাতুল্লিল আলামিন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঠিকানা হিসেবে মনোনীত করলেন, তখনই ইয়াসরিবের ভাগ্য বদলে গেল। এর নাম হয়ে উঠল ‘মদিনাতুর রসুল’ বা রসুলুল্লাহ (সা.)-এর নগরী।
সেই থেকে এটি কেবল একটি শহর নয়; বরং প্রেম, রহমত, ইমান ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক চিরসবুজ বাগান। মদিনা মুনাওয়ারা আসমান ও জমিনের এক অনুপম রত্ন। এর বাতাসে মিশে আছে দরূদ ও সালামের সুর, এর ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে নবীপ্রেমের সুবাস। পৃথিবীর অগণিত মুমিনের হৃদয় প্রতিদিন এই শহরের দিকে আকুল হয়ে ছুটে যায়।
কারণ এটি সেই ভূমি, যেখানে ঘুমিয়ে আছেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম মহামানব, প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
রসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাকে কেবল একটি নগরী হিসেবে দেখেননি; বরং একে তিনি ‘হারাম’ তথা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ও সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘নিশ্চয়ই হজরত ইবরাহিম (আ.) মক্কাকে হারাম ও সম্মানিত ঘোষণা করেছেন, আর আমি মদিনার দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে হারাম ঘোষণা করলাম। সেখানে কোনো গাছ কাটা যাবে না এবং কোনো শিকার তাড়া করা যাবে না (সহিহ মুসলিম-১৩৭৪)।
এই ঘোষণা প্রমাণ করে মদিনা কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; বরং এটি নববী সম্মান ও আসমানি পবিত্রতার প্রতীক। মদিনার জীবন সব সময় আরাম-আয়েশে পূর্ণ হবে, এমন নয়। সেখানে জীবিকার সংকট, কষ্ট কিংবা দারিদ্র্য আসতেই পারে। কিন্তু সেই কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য রয়েছে এক অপূর্ব সুসংবাদ।
হজরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি মদিনা মুনাওয়ারার বিপদ ও দুঃখকষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষ্য দেব অথবা তার জন্য শাফায়াত করব (সহিহ মুসলিম-১৩৭৭)।
কী অপূর্ব সৌভাগ্য! যে শহরের কষ্টও নবীজি (সা.)-এর শাফায়াতের কারণ হয়ে যায়, সেই শহরের মর্যাদা কত মহান হতে পারে! মদিনার বাসিন্দাদের সম্মান করা মূলত রসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিই সম্মান প্রদর্শন। পক্ষান্তরে তাদের প্রতি বিদ্বেষ বা অনিষ্টের চিন্তা করাও ভয়াবহ অপরাধ।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি এই শহরের (মদিনার) অধিবাসীদের কোনো অনিষ্ট করার ইচ্ছা করবে, আল্লাহতায়ালা তাকে এমনভাবে গলিয়ে দেবেন, যেভাবে লবণ পানিতে গলে যায় (সহিহ মুসলিম-১৩৮৬)। ’
এ হাদিসে মদিনার অধিবাসীদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ হেফাজত ও ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তারা সেই নগরীর মানুষ, যে নগরীকে আল্লাহর হাবিব নিজের আবাসস্থল বানিয়েছেন। যখন পৃথিবীজুড়ে ফেতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়বে, মানুষ দীনের পথ থেকে বিচ্যুত হতে থাকবে, তখন প্রকৃত ইমান আশ্রয়ের জন্য আবার মদিনার দিকেই ফিরে আসবে।
নবী করিম (সা.) অত্যন্ত চমৎকার উপমায় এ সত্যটি তুলে ধরেছেন ‘নিশ্চয়ই ইমান মদিনার দিকে এভাবে গুটিয়ে আসবে, যেভাবে সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে যায় (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩১১১)। ’
অর্থাৎ মদিনা হবে ইমানের নিরাপদ দুর্গ, ফেতনার যুগে আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা। মদিনার পবিত্র ভূমিতে মৃত্যুবরণ করা এবং জান্নাতুল বাকির সৌভাগ্য অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা। কারণ সেখানে মৃত্যু মানে নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যের আশীর্বাদ লাভ।
রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। কেননা যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্য সাক্ষ্য দেব (সুনানে ইবনে মাজাহ-৩১১২)। ’
এই কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মদিনায় মৃত্যু কামনা করতেন। আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ফারুক (রা.) প্রায়ই এই হৃদয়স্পর্শী দোয়াটি করতেন ‘হে আল্লাহ! আমাকে আপনার পথে শাহাদাত নসিব করুন এবং আপনার রসুল (সা.)-এর শহরে আমার মৃত্যু দান করুন।
আল্লাহতায়ালা তাঁর সেই দোয়া কবুল করেছিলেন। তিনি শাহাদাতের মর্যাদাও পেয়েছেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে নবীজি (সা.)-এর প্রিয় শহর মদিনাতেই। পরিশেষে বলা যায়, মদিনার প্রতি ভালোবাসা নিছক আবেগ নয়; এটি ইমানের দাবি। যে হৃদয়ে মদিনার মহব্বত নেই, সে হৃদয় নবীপ্রেমের পূর্ণ স্বাদ কখনোই উপলব্ধি করতে পারে না।
আল্লাহতায়ালা আমাদের অন্তরে মদিনার অগাধ মহব্বত দান করুন, মদিনার আদব ও সম্মান রক্ষার তাওফিক দিন এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে সেই পবিত্র ভূমিতে মৃত্যুবরণের সৌভাগ্য নসিব করুন।