মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের প্রথম দিকের দিনগুলোতে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে তার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইলের হাতেই ছিল। এ নিয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে। তবে এখন বিষয়টি আর ততটা নিশ্চিত মনে হচ্ছে না। ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী রোববার বলেছেন, ‘যুদ্ধের শেষ আমাদের হাতেই’।
তিনি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওয়াশিংটনের বাহিনী প্রত্যাহার ও হামলার ফলে তাদের সব ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেয়ার আহ্বান জানান। তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কণ্ঠ তিন সপ্তাহ আগে এতটা আত্মবিশ্বাসী শোনাবে- এমনটা খুব একটা সম্ভাব্য মনে হয়নি।
সংঘাতের শুরু হয় ইসরাইলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধবিমান দ্রুতই দেখিয়ে দেয় যে, তারা প্রায় বাধাহীনভাবে ইরানের আকাশে অভিযান চালাতে পারে। গভীর গোয়েন্দা সক্ষমতার ভিত্তিতে তারা হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। তাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বলতে মূলত নিজেদের পক্ষের ভুলবশত হামলাই ছিল।
এর জবাবে ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একের পর এক হামলা চালায়, যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠেকিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত ইরানের হামলায় ইসরাইলে ১২ জন নিহত হয়েছেন। তবে গত বছর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া তুলনামূলক অনেক স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের তুলনায় এই সংখ্যা এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে যে হামলা চালিয়েছে তা তুলনামূলক কম সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু তারপরও ওইসব দেশ তাদের বাসিন্দা ও অবকাঠামোকে পঙ্গু করে দেয়ার মতো বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। যদিও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। আর শান্তি, বিলাসিতা ও সমৃদ্ধির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তাদের সুনামও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিদিন নতুন নতুন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের বিপুল প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবুও মনে হতে পারে যে, এই যুদ্ধের ট্রিগার কার হাতে থাকবে তার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ কত দিন চলবে তা নিয়ে একাধিক সময়সীমার কথা বলেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পরই কেবল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। অনেক বিশ্লেষকের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তারা কখনোই চায়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে; তেলের দাম বেড়েছে এবং পাম্পে জ্বালানির মূল্য হঠাৎ উঁচুতে উঠেছে। এখন দ্রুত যুদ্ধ থামানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক- দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ছেন।
জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখনও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রই নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে আপনি এজেন্ডা ঠিক করে দিচ্ছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্র ফুরিয়ে আসছে। তাই তেহরানের সামনে খোলা ছিল একটাই পথ- সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলা এবং আশা করা, এতে কোনোভাবে যুদ্ধ থেমে যাবে। সে কারণেই তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা করেছে এবং তারপর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে।
কেউ কেউ ধারণা দিয়েছেন, তেহরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের পথে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনীকে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে ওই মেরিন সদস্যদের পৌঁছাতে অন্তত আরও দুই সপ্তাহ লাগবে।