বিশেষ প্রতিবেদকঃ
বাংলাদেশে একসময়ের জঙ্গিবাদ সমস্যা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে? জঙ্গিবাদ এই দেশে মাথাচাড়া দেওয়ার অনেক রসদ রয়েছে। এর মধ্যে আছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা, সমাজের বিভ্রম, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং গণমাধ্যমের ভাষারও ইতিহাস।
এই কারণে কারাগার থেকে জঙ্গিদের মুক্তি এক অর্থে একটি মতাদর্শের পুনরাগমনের সুযোগ বটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে যে প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তার সবচেয়ে কম আলোচিত দিক ছিল উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের অভিযোগে আগের সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ধারাবাহিক জামিন ও মুক্তি। আসামির জামিন পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের অভিযোগ থাকা ব্যক্তি জামিনের পর রাষ্ট্রের নজরদারি, হাজিরা নিশ্চিতকরণ এবং পুনর্গঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্কের ওপর গোয়েন্দা তদারকি ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই জায়গাতেই ভয়াবহ ব্যর্থতা ঘটেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে আইইডি বিস্ফোরণ, প্রেসার কুকার বোমা, পাইপ বোমা এবং পরিকল্পিত নাশকতার ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে একটি পুরনো সত্য। উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ কখনো শূন্য থেকে জন্মায় না। তাকে সুযোগ করে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক নব্য জেএমবির উত্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি নাম এড়ানো যায় না। নাজমুল হাসান মামুন, যাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী দীর্ঘদিন ‘বোমারু মামুন’ নামে চিহ্নিত করে এসেছে। ২০১৭ সালে গ্রেপ্তারের পর তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর মুক্তি পাওয়ার পরপরই কেরানীগঞ্জ ও সাভার এলাকায় নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলেন বলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট জানায়। তদন্তে উঠে আসে, তার নেতৃত্বে অন্তত ১৫ জনকে নিয়ে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি চলছিল।
কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলা, কুমিল্লার মন্দিরে বিস্ফোরণ, ডেমরার পাইপ বোমা এবং সাভারের প্রেসার কুকার বোমা—এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কের যোগসূত্রও তদন্তকারীরা তুলে ধরেছেন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্যত্র। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পেলেন, সেটি আদালতের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তিনি কিভাবে অল্প সময়ে বিস্ফোরক তৈরির অবকাঠামো পুনর্গঠন করলেন? কোথায় ছিল নজরদারি? কে অনুসরণ করছিল তার যোগাযোগ, অর্থের উৎস এবং সংগঠনের পুনরুজ্জীবন? এসব প্রশ্নে নীরবতা অবলম্বন উগ্রপন্থার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীর মুক্তিও একইভাবে প্রতীকী। এই নেতা ২০১৩ সাল থেকে কারাবন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে তাকে বিভিন্ন প্রকাশ্য সমাবেশেও দেখা যায়, যার মধ্যে শাহবাগের রাজনৈতিক সমাবেশ বিশেষভাবে আলোচিত। হারুন ইজহারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু মামলা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন মামলায় তিনি ধারাবাহিকভাবে জামিন পান।
অন্যদিকে বিক্রমপুরীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক। তাকে তথ্য-যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক অনলাইন প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছে, যেখানে ‘ব্লাসফেমি’র অভিযোগে মানুষ হত্যার আহ্বান জানানো হতো। আরো বিস্ময়কর হলো, ৫ আগস্টের পর তিনি কাশিমপুর কারাগারের সামনে অনুসারীদের নিয়ে বন্দি জঙ্গিদের মুক্তির দাবিতে উপস্থিত হন এবং ‘বৈষম্যবিরোধী কারামুক্তি আন্দোলন’-এর সমন্বয়ক হিসেবে প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকেন। তাকে পুনরায় আটক করতে সরকারের প্রায় ষোলো মাস লেগেছে।
এটি কি শুধুই গোয়েন্দা ব্যর্থতা? নাকি এটি রাজনৈতিক সংকেতও? যখন রাষ্ট্র উগ্র বক্তৃতাকে দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, তখন সেই বক্তৃতা ধীরে ধীরে সামাজিক বৈধতা পেতে শুরু করে। কোনো কোনো সময় একটি পরিসংখ্যান একটি দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী হয়।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের ১,৬১১ জন সদস্য জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ আগস্টের পর জামিন পাওয়া প্রায় ৩৮০ জন আদালতে নিয়মিত হাজিরাই দিচ্ছেন না। একই সঙ্গে জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, হিযবুত তাহরীর, হুজি এবং নব্য জেএমবির বহু সদস্য এখনো পলাতক। এই সংখ্যাগুলো শুধু বিচারব্যবস্থার চাপ বোঝায় না। এগুলো রাষ্ট্রের তদারকি ব্যবস্থার ভাঙনও প্রকাশ করে।
জামিন মানে তো কেবল মুক্ত বিচরণ নয়, জামিন মানে শর্তসাপেক্ষ স্বাধীনতা। সেই শর্ত কার্যকর করার জন্য পুলিশ, প্রসিকিউশন, প্রবেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই কাঠামো কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
এ ছাড়া গণমাধ্যমের ভাষাও অনেক সময় বিভ্রম তৈরি করে। রাজনৈতিক হয়রানির মামলার সমালোচনা করা এক বিষয়, সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জনমনে ‘মজলুম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আরেক বিষয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি তখন অনুসারীদের কাছে অপরাধী নন, শহীদ। উগ্রপন্থার শক্তিশালী অস্ত্র অনেক সময় বিস্ফোরক নয়, বরং বয়ান তৈরির প্রচেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকদের যুক্তি—আদালত স্বাধীন ছিল, সরকার জামিন দেয়নি। আইনগতভাবে এই বক্তব্য সঠিক। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ। কারণ সরকার জামিন না দিলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো সরকারের অধীনেই পরিচালিত হয়। জামিনপ্রাপ্ত উচ্চ-ঝুঁকির ব্যক্তিদের নজরদারি, নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করা, পুনরায় সংগঠিত হওয়ার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অনলাইন উগ্র প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করা নির্বাহী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই জায়গায় ব্যর্থতার প্রমাণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিজের তথ্যেই স্পষ্ট।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল হলো রাজনৈতিক বন্দি আর উগ্রবাদী-জঙ্গিকে একই নৈতিক শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া। একজন ভিন্নমতের রাজনীতিক রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হতে পারেন। একজন জঙ্গি রাষ্ট্রের শত্রু। এই পার্থক্য মুছে গেলে আইনও বিভ্রান্ত হয়, জনমতও।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামপন্থী উগ্র সংগঠনগুলো কখনো কারো স্থায়ী মিত্র হয়নি। তারা প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিকেই শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করেছে নিজেদের মতাদর্শ বিস্তারের জন্য। ক্ষমতার সাময়িক সমীকরণ তাদের লক্ষ্য নয়। তাদের লক্ষ্য রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন। এই সত্যটি ভুলে গেলে ভবিষ্যতের সরকারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে।
বস্তুত একটি সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি বোঝা যায় সে কতজনকে কারাগারে রাখে তা দিয়ে নয়। বরং বোঝা যায় রাষ্ট্র কাকে মুক্তি দেয়, কেন মুক্তি দেয় এবং মুক্তির পর কিভাবে আইনের শাসন কার্যকর রাখে তা দিয়ে।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি। জঙ্গিবাদকে দমন করতে গিয়ে যেন বিরোধী মত দমন না হয়। আবার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে যেন সহিংস মতাদর্শ মানবিকতার মুখোশ না পায় । এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ।
রেফারেন্স :
বোমারু মামুন ও নব্য জেএমবি
• ‘জেল পলাতক ও জামিনে মুক্ত জঙ্গিরা সক্রিয়’ — TOB News: https://bangla.tob.news/জেল-পলাতক-ও-জামিনে-মুক্ত-জ/
মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানী
• ‘জামিনে মুক্তি পেলেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিম উদ্দিন’ — RTV Online: https://www.rtvonline.com/country/288321
• ‘মুহাম্মদ জসীমউদ্দীন রহমানী’ — উইকিপিডিয়া: https://bn.wikipedia.org/wiki/মুহাম্মদ_জসীমউদ্দীন_রহমানী
• ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে জঙ্গিগুরু জসীমউদ্দীন রাহমানী’ — বিডিডাইজেস্ট: https://bddigest.com/news/23302/
হারুন ইজহার
• ‘দুই বছর পর জামিনে মুক্ত হেফাজত নেতা হারুন ইজহার’—আজকের পত্রিকা : https://www.ajkerpatrika.com/bangladesh/chattogram/ajp9o83eyqebu
• ‘হারুন ইজহার’ — উইকিপিডিয়া: https://bn.wikipedia.org/wiki/হারুন_ইজহার
আতাউর রহমান বিক্রমপুরী
• ‘আতাউর রহমান বিক্রমপুরী গ্রেপ্তার’—দেশ রূপান্তর : https://www.deshrupantor.com/649364/আতাউর-রহমান-বিক্রমপুরী-গ্রেপ্তার
• ‘আতাউর রহমান বিক্রমপুরী গ্রেপ্তার’— bdnews24 বাংলা: https://bangla.bdnews24.com/bangladesh/1cec667d37a7
• ‘গ্রেপ্তারের পর আতাউর রহমান বিক্রমপুরী কারাগারে’— প্রথম আলো: https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/5u62rv4yud
• ‘তৌহিদী জনতায় জঙ্গী ও আওয়ামী কানেকশন’— বিভিনিউজ২৪: https://www.bvnews24.com/national/news/173272
(বাংলাদেশ প্রতিদিনের সৌজন্যে)