বিশ্বের গভীর সমুদ্রে মার্কিন আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (পিএলএএন) তাদের নৌবহরে যুক্ত করেছে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আধুনিক জেড-৮ডি হেলিকপ্টার।
মূলত সাবমেরিন বিরোধী যুদ্ধ (অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার) পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা এই যুদ্ধবিমানটি চীনের নৌবাহিনীকে এক বিশাল সামরিক সুবিধা এনে দেবে। সাবমেরিন শিকারের পাশাপাশি এটি উভচর আক্রমণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং লজিস্টিকস মিশনেও বড় ভূমিকা রাখবে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এই হেলিকপ্টারের প্রথম স্পষ্ট ছবি বিশ্ববাসীর সামনে আসে এবং এটি এখন পুরোদমে সার্ভিসে রয়েছে।
নতুন এই হেলিকপ্টারটির অত্যাধুনিক ক্ষমতা চীনের নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজের—বিশেষ করে টাইপ ০৫২ডি এবং টাইপ ০৫৫ ক্লাসের ডেস্ট্রয়ারগুলোর সাবমেরিন বিধ্বংসী ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ারগুলোর পেছনের হ্যাঙ্গারে সহজেই জেড-৮ডি হেলিকপ্টার রাখা সম্ভব।
আধুনিক সেন্সর ও শক্তিশালী আত্মরক্ষা ব্যবস্থা
জেড-৮ডি হেলিকপ্টারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক সেন্সর এবং সেলফ-প্রোটেকশন সুইট বা আত্মরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিসাইল ওয়ার্নিং সেন্সর (যা ধেয়ে আসা মিসাইল শনাক্ত করে), লেজার ওয়ার্নিং রিসিভার, রাডার ওয়ার্নিং ইকুইপমেন্ট এবং কাউন্টারমেজার ডিসপেন্সার।
এই আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো শত্রুভাবাপন্ন বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মিসাইল হামলা থেকে হেলিকপ্টারটিকে সুরক্ষিত রাখবে এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রেও এর টিকে থাকার ক্ষমতাকে অনেক বাড়িয়ে দেবে।
কেন জেড-৮ডি সাবমেরিন হান্টিংয়ে এত নিখুঁত?
জেড-৮ হেলিকপ্টারের বিশাল আকৃতি একে সাবমেরিন বিরোধী যুদ্ধের জন্য অনন্য করে তুলেছে। চীনের আরেকটি বহুল ব্যবহৃত মাঝারি ওজনের হেলিকপ্টার জেড-২০জে-এর তুলনায় এটি আকারে বড় হওয়ায় অনেক বেশি সামরিক সুবিধা দেয়।
সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা সাবমেরিন শনাক্ত করার জন্য এটি বিপুল পরিমাণ সোনোবুয় (এক ধরণের ভাসমান শব্দগ্রাহক যন্ত্র) বহন করতে পারে, যা সমুদ্রের বিশাল এলাকা জুড়ে অ্যাকোস্টিক সার্চ ফিল্ড বা শব্দতরঙ্গ অনুসন্ধান ক্ষেত্র তৈরি করে। বড় আকারের মিশন ইকুইপমেন্ট এবং ভারী অস্ত্র বহনের পাশাপাশি এতে রয়েছে বিশাল জ্বালানি ধারণক্ষমতা।
এর নতুন করে ডিজাইন করা ফুসেলেজ (মূল কাঠামো) এবং বড় আকারের সাইড স্পনসনস-এ অতিরিক্ত জ্বালানি রাখা যায়। ফলে এটি সমুদ্রের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে টহল বা মেরিটাইম পেট্রল চালাতে সক্ষম। তাছাড়া এর নতুন নকশাকৃত সম্মুখভাগ বা নোজ, আপগ্রেডেড ককপিট এবং উন্নত অ্যারোডাইনামিকস আগের জেড-৮ নেভাল ভ্যারিয়েন্ট বা নৌ-সংস্করণগুলোর চেয়ে একে অনেক বেশি গতিশীল করেছে।
যেভাবে কাজ করবে এই সাবমেরিন শিকারি
একটি যুদ্ধজাহাজের নিজস্ব সোনার ক্ষমতা যতই উন্নত হোক না কেন, তা জাহাজের অবস্থান এবং পানির নিচের পরিবেশগত সীমানার কারণে সীমিত থাকে। কিন্তু একটি জাহাজ-বাহিত হেলিকপ্টার মুহূর্তের মধ্যেই ডেস্ট্রয়ার থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের সন্দেহভাজন অঞ্চলে পৌঁছে দ্রুত তল্লাশি চালাতে পারে।
জেড-৮ডি হেলিকপ্টারগুলো সমুদ্রের ওপর স্থিরভাবে ভেসে থেকে পানির নিচে ডিপিং সোনার নামিয়ে দিতে পারে। এক জায়গায় কাজ শেষ হলে দ্রুত অন্য জায়গায় গিয়ে আবার সোনার নামিয়ে নিখুঁত ছবি তৈরি করতে পারে। একবার শত্রু সাবমেরিনের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গেলে, ডেস্ট্রয়ারটিকে পজিশনে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে হেলিকপ্টারটি নিজেই তার হালকা ওজনের সাবমেরিন-বিধ্বংসী টর্পেডো দিয়ে সরাসরি নিখুঁত আক্রমণ চালাতে পারে। এতে শত্রু সাবমেরিনটি পালানোর কোনো সুযোগই পায় না।
বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ডেস্ট্রয়ার বহর সম্প্রসারণ করছে, যা বাকি বিশ্বের সব দেশের মিলিত গতির চেয়েও বেশি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা নৌবাহিনীগুলো চীনের সমকক্ষ ডেস্ট্রয়ারের অভাব মেটাতে প্রধানত অ্যাটাক সাবমেরিন-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে চীনের এই ব্লু-ওয়াটার (দূর সমুদ্র) অপারেশনের সময় মার্কিন সাবমেরিনগুলোই ছিল চীনের বড় মাথা ব্যথার কারণ। কিন্তু এখন চীনের শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ার বহরের সাথে এই নতুন 'হান্টার-কিলার' জেড-৮ডি হেলিকপ্টারের যুগলবন্দী মার্কিন সাবমেরিনগুলোর জন্য এক মহা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াল। এর ফলে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম অত্যন্ত আধুনিক মার্কিন সাবমেরিনগুলোর জন্যও এখন সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র: মিলিটারি ওয়াচ ম্যাগাজিন