ছবি: দৈনিক বাংলা
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেনীর পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন কাজের উদ্বোধন শেষে সাধারণ মানুষের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন।
কতিপয় রাজনৈতিক দল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিএনপিকে দেশের মানুষ দায়িত্ব দিয়েছে এবং দলটি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে—আইন সবার জন্য সমান। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনীর পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন কাজের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর এলাকায় মুহুরী নদীর খেয়াঘাট তীরে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি উপস্থিত থেকে বাঁধ নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু দুষ্ট মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিএনপিকে যখন এ দেশের মানুষ দায়িত্ব দিয়েছে, বিএনপি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে, আইন সকলের জন্য সমান। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমরা দেখছি কিছু রাজনৈতিক দল কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, এখানে বহু মুরুব্বি উপস্থিত আছেন, যারা এখন অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। ১৯৭১ সালে তাদের কী ভূমিকা ছিল, আমরা দেখেছি। সেই সময় তারা যেভাবে অন্যায় করেছিলেন, মা-বোনদের হয়রানি-নির্যাতন করেছিলেন, আমরা দেখেছি। ১২ তারিখের নির্বাচনে কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করে তারা কিছু আসনে নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেভাবে ৭১ সালে মা-বোনদের ওপর তারা নির্যাতন করেছিলেন, ঠিক একইভাবে আবারও তাদের নারী নির্যাতন শুরু হয়েছে। এই গুপ্ত বাহিনীর সদস্যরা কীভাবে নারীদের ওপর নির্যাতন করছেন, আমরা তা দেখছি। শুধু নির্যাতন করেই তারা ক্ষান্ত হননি। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। একটি মানুষের জীবনাবসান করে দিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সময় এসেছে আমাদের সতর্ক হওয়ার। সময় এসেছে ভাববার—কাদের কথা বিশ্বাস করব আর কাদের কথা বিশ্বাস করব না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই দলের নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘দয়া করে নিজের ঘরের দিকে আগে তাকান। নিজের ঘরের লোকেরা কীভাবে নারী নির্যাতন করছে, কীভাবে কী করছে, সেটি আগে সামাল দেন। তারপর অন্যকে কিছু বলতে আসেন।’
বন্যা নিয়ন্ত্রণে ১,৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প: পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি ফেনীর মুহুরী ও কহুয়া নদীকেন্দ্রিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহাম্মেদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’ কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।
একনেকে অনুমোদিত এ মেগা প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, সাড়ে ৮৩ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন, সাড়ে ১১ কিলোমিটারের বেশি নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ এবং একটি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো, কৃষি ও সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীতীরবর্তী এলাকার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
২০২৪ সালে মুহুরী ও কহুয়া নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলে পুরো ফেনী জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়। এ ছাড়া প্রতিবছর অতিবৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের বন্যা থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের দাবি ছিল—সীমান্ত জনপদের নদীগুলোতে রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।
মুহুরী-কহুয়া নদী খননের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেশিদিন আগের কথা নয়, দুই-আড়াই বছর আগে বিশাল একটি বন্যা হয়েছিল। এখানকার মানুষসহ নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরের লাখ লাখ মানুষের বাড়িঘর ভেসে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, নদী-খাল খনন করব—নির্বাচনের আগে এ কথাটি আমরা বলেছিলাম। কারণ বিএনপি রাজনীতি করে মানুষের জন্য। খাল খনন করা যে কতটা প্রয়োজন, তা বন্যা হোক বা কৃষিজমিতে পানি দেওয়া কিংবা মানুষের পানি ব্যবহারের সুবিধার জন্য হোক—বিভিন্ন কারণে বোঝা যায়।
স্থানীয় সূত্রমতে, ঐতিহাসিকভাবে ফেনীর ১২২ কিলোমিটার বাঁধের সূচনা হয়েছিল খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে তার হাত ধরে। এবার সেই প্রকল্পের আধুনিকায়ন ও টেকসই বিস্তৃত রূপ নিয়ে নতুন বাঁধের সূচনা হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে।
নানাবাড়ির স্মৃতিচারণ: নিজের নানাবাড়িতে আসার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু বছর পর নানাবাড়িতে আসলাম। প্রথম আমি এখানে এসেছিলাম ১৯৮৪ সালে সম্ভবত। তারপর ১৯৯১ সালে আপনাদের মেয়ে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে যখন নির্বাচিত করেছিলেন, তখন নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন এ রাস্তা ছিল না।
তারেক রহমান বলেন, কাজ করতে হবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। কাজ করতে হবে নানাবাড়ির মানুষের জন্য। সেই কাজের অংশ হিসেবে আজ মুহুরী-কহুয়া নদীর পুনঃখনন কাজ শুরু করেছি।
উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা: ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্যের দাবির প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৩০ বেডের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে আপনাদের সন্তান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসেন, তখন ২০ বেড বাড়িয়ে সমগ্র বাংলাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ৫০ বেডের করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের রেখে যাওয়া দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলা হাসপাতালকে দেড়শ শয্যায় উন্নীত করবে। উপজেলার মানুষকে যেন কষ্ট করে বাইরে যেতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করা হবে। এখানে বসে সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
আন্দোলন ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক বছর ধরে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছি। স্বৈরাচার গত ১৭ বছর ধরে মানুষের টুঁটি চেপে ধরে রেখেছিল। দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। মানুষকে তারা কথা বলতে দেয়নি। মানুষের কষ্ট, দুঃখ-দুর্দশা তারা দূর করেনি। তিনি আরও বলেন, ২৪-এর ৫ আগস্ট এই দেশের মানুষ সেই স্বৈরাচারকে এ দেশ থেকে বিদায় করেছে। এই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দায়িত্ব দিয়েছে।
মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন (ভিপি), সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়া উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।