ভারতের কেরালা রাজ্যে উগ্র রাজনীতি আর ধর্মীয় মেরুকরণের চেনা বৃত্ত ভেঙে এক অভূতপূর্ব মানবিকতার নজির সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত ও তীব্র ক্যান্সারে আক্রান্ত ৬৪ বছর বয়সী এক সাবেক আরএস এস কর্মীর মৃত্যুর পর, হিন্দু শাস্ত্রীয় রীতি মেনে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন ও মুখাগ্নি করেছেন মুসলিম লীগ নেত্রী এবং কেরালা জেলা পঞ্চায়েতের উন্নয়ন বিষয়ক চেয়ারপারসন ইরফানা ইকবাল। তাও আবার এমন এক দিনে, যেদিন মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে মহররম পালন করছিল। বোরকা পরিহিত ইরফানা ইকবালের শ্মশানে শেষকৃত্য করার এই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা পুরো ভারতে ব্যাপক আলোড়ন ও প্রশংসার ঝড় তুলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় এক মাস আগে। কেরালার মাঞ্জেশ্বর তালুকের চুগুরুপাদ এলাকার একটি পরিত্যক্ত দোকানের বারান্দায় মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিলেন নারায়ণ তোত্তাথোদি (৬৪) নামের ওই ব্যক্তি। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার অভাবে তার মুখের ক্যান্সার এমন এক মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ক্ষতের দুর্গন্ধের কারণে সাধারণ মানুষ তার কাছে ঘেঁষতে পারছিল না। অনাহারে-অর্ধাহারে তার শরীরের হাড় জিরজিরে অবস্থা হয়ে গিয়েছিল।
স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য শেরিফ চিনাল বিষয়টি জানান ইরফানা ইকবালকে, যিনি উপ্পালায় ‘শেখ জায়েদ ওল্ড এজ হোম’ এবং ‘শেখ জায়েদ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি দাতব্য সংস্থা পরিচালনা করেন। খবর পেয়েই ইরফানা ছুটে যান এবং জানতে পারেন যে নারায়ণ গত সাত দিন ধরে কিছুই খাননি। ইরফানা তাৎক্ষণিকভাবে জেলা সংগ্রাহক (কালেক্টর) ও জেলা চিকিৎসা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে তাকে কোঝিকোড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন।
দুই স্ত্রী, সন্তান ও বোন কেউ নেয়নি লাশের দায়িত্বঃ
হাসপাতালে পাঁচ সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৩ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নারায়ণ। কিন্তু মৃত্যুর পর জন্ম নেয় এক চরম নির্মমতার গল্প। নারায়ণের দুই স্ত্রী, সন্তান এবং নিজের আপন বোন-কেউই তার মৃতদেহের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। তারা লিখিতভাবে জানিয়ে দেন যে, এই লাশের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং মৃতদেহ যেন ইরফানা ইকবালের জিম্মায় দিয়ে দেওয়া হয়।
নারায়ণের আপনজনেরা যখন তাকে ত্যাগ করে, তখন এগিয়ে আসেন ইরফানা। তিনি হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নারায়ণের মরদেহ উপ্পালায় নিয়ে আসেন এবং ২৭ জুন মহররমের দিনে চেপুগোলি সরকারি শ্মশানে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নারায়ণের মুখাগ্নি করেন। শ্মশানে ইরফানার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেবা ভারতী (আরএসএস-এর সেবা শাখা) স্বেচ্ছাসেবক রঘু এবং স্থানীয় সমাজকর্মী রিয়াজ ও মাহমুদ।
ফেসবুক বার্তায় ইরফানা: ‘মেয়ের মতো শেষ বিদায় জানালাম’
শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্নের পর ইরফানা ইকবাল তার ফেসবুক হ্যান্ডেলে আবেগঘন একটি পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, “নারায়ণদার কোনো নিকটাত্মীয় তার শেষ সময়ে পাশে আসেনি। আমি একজন মেয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে সনাতন ধর্মের রীতিনীতি মেনে উনার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছি। ধর্ম আর রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে হলো মানুষের মানবতা।”
তিনি আরও বলেন, “উনার এই বয়সে এভাবে মারা যাওয়ার কথা ছিল না। যদি পরিবার সামান্য একটু যত্ন নিত, তবে হয়তো তিনি আরও কিছুদিন বাঁচতেন। যখন এক মাস আগে রাস্তা থেকে উনাকে উদ্ধার করি, তখন স্থানীয় মানুষকে কথা দিয়েছিলাম যে উনাকে সুস্থ করে আমার বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় দেব। বেঁচে থাকতে উনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তাই মৃত্যুর পর উনাকে আমি এভাবে ফেলে দিতে পারি না।”
ইরফানা ইকবালের এই মানবিক উদ্যোগ কেরালার রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এক পজিটিভ বার্তা দিয়েছে। কেরালায় যেখানে আরএসএস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধ দীর্ঘদিনের, সেখানে একজন সাবেক আরএসএস কর্মীর শেষ বিদায়ে মুসলিম লীগ নেত্রীর এই ভূমিকা প্রমাণ করেছে যে, চরম রাজনৈতিক বৈরিতার মাঝেও ভারতীয় সমাজের ভেতর মানবিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির শিকড় কতটা গভীর।
বর্তমানে ইরফানা ইকবালের ‘শেখ জায়েদ ওল্ড এজ হোম’-এ বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের প্রায় ৫০ জন অসহায় ও পরিত্যক্ত প্রবীণ মানুষ আশ্রয় পেয়ে সুখে আছেন। ইরফানা আশা প্রকাশ করেন, এই ঘটনাটি সমাজে বৃদ্ধ বাবা-মা বা প্রবীণদের পরিত্যাগ করার নির্মম প্রবণতার বিরুদ্ধে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করবে।