ছবিঃ সংগৃহীত
নগর ও গ্রামীণ অবকাঠামো, রেল যোগাযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সড়ক, সেতু, নৌপরিবহন ও নারীদের উদ্যোক্তা তৈরিসহ বিভিন্ন খাতে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত ১৩ প্রকল্পের মধ্যে ১০টি নতুন, দুটি সংশোধিত এবং একটি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প।
সভায় উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে নিজস্ব দক্ষ জনবল কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, রামপালে নির্মাণ হতে যাওয়া সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি যুক্ত করার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হলেও দ্রুত সংশোধন করে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য ব্যাটারির ব্যবস্থা করতে হবে। বন্ড ছেড়ে এ প্রকল্পের খরচ তোলার কথাও বলা হয়েছে। এতে ব্যয় কিছুটা বাড়লেও তা করা হবে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, এ বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ৭ টাকার কম।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. কামরুন্নাহার, ড. মঞ্জুর হোসেন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এসএম মোছাদ্দেক।
নগর অবকাঠামোয় ৭ হাজার কোটি: একনেকে অনুমোদিত সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি ‘গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধন। নগরবাসীর অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা উন্নয়নে প্রকল্পটির পরিধি ও বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। মূল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে তা ৪ হাজার ৪১৮ কোটি ৫০ লাখ এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ৫ হাজার ৭২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা করা হয়। এবার আরও ১ হাজার ৩১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পুরো অর্থই সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে। একনেকের অনুমোদিত ১৩ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ এ প্রকল্পে বরাদ্দ হচ্ছে।
গ্রামীণ অবকাঠামোয় ৩,৭৬৭ কোটি: সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ৩ হাজার ৭৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এতে গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনসেবার পরিধি বাড়বে।
৩০ লোকোমোটিভে ২,৭৬৯ কোটি: বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ এবং প্রকল্প ঋণ ১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলের সক্ষমতা বাড়বে।
রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ: রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে ব্যয় হবে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ।
গাজীপুর, ঢাকা ও রংপুরে অবকাঠামো উন্নয়ন: গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণে ২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ ১৫ হাজার এবং সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৮৮ কোটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮ ওয়ার্ডের সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়নে ৭৮৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৯ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার এবং ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়ন ২৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৯ লাখ ৩ হাজার টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৯৫ লাখ ৩২ হাজার এবং নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮০ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসনে রংপুরে ২১০ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
নৌপরিবহনে ২,১৬৮ কোটি: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন হয়েছে। এতে ব্যয় ৭৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ২ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ৬০ কোটি ৪৪ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্যারিসে চ্যান্সারি ভবন, করতোয়া সেতু: ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয় করা চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করতে সংস্কার ও আধুনিকায়নে ২১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন।
পঞ্চগড়ের ভজনপুর থেকে পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণে ২০৩ কোটি ৫২ লাখ ৬৬ হাজার টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর পুরো অর্থও সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে।
পার্বত্য সড়কে ব্যয় বাড়ল: থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন হয়েছে। এতে ব্যয় ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা বাড়িয়ে মোট ৯২৬ কোটি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে। মূল ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনে তা ৮৫৩ কোটি ১২ লাখ এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ৮৮৯ কোটি ৬২ লাখ ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছিল। এবার ব্যয় আরও বাড়ানোর পাশাপাশি মেয়াদ চতুর্থবার বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
নারীদের উদ্যোক্তা তৈরিতে ১৮৪ কোটি: সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ১৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর। এ ছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রীর মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের একটি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জয়পুরহাটের নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল ও খাড়োয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্প।
সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।