দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। পুরো অর্থবছরজুড়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও শেষ মাস জুনে সেই ধারায় সামান্য ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরে এসেছিল ৩০ দশমিক ৩২৯ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭.৩ শতাংশ।
তবে পুরো অর্থবছরের এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে জুন মাসে রেমিট্যান্সে সামান্য পতন দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ দেশে এসেছে ২ দশমিক ৮০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ২ দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ০.৬ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩০ জুন ব্যাংক হলিডে থাকায় ১১টি ব্যাংকের তথ্য প্রাথমিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে জুন মাসের চূড়ান্ত হিসাব আরও কিছুটা বাড়তে পারে।
বছরজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় প্রতিটি মাসেই রেমিট্যান্স দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। জুলাইয়ে আসে প্রায় ২.৪৮ বিলিয়ন ডলার, আগস্টে ২.৪২ বিলিয়ন, সেপ্টেম্বরে ২.৬৯ বিলিয়ন, অক্টোবরে ২.৫৬ বিলিয়ন, নভেম্বরে ২.৮৯ বিলিয়ন এবং ডিসেম্বরে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার।
নতুন বছরের শুরুতেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। জানুয়ারিতে আসে ৩.১৭ বিলিয়ন, ফেব্রুয়ারিতে ৩.০২ বিলিয়ন, মার্চে ৩.৭৫ বিলিয়ন, এপ্রিলে ৩.১২ বিলিয়ন এবং মে মাসে ৩.৪৩ বিলিয়ন ডলার। মার্চ মাস ছিল অর্থবছরের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের মাস। জুনের প্রাথমিক হিসাব যুক্ত করে অর্থবছরের মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৩৫.৫৬২ বিলিয়ন ডলার।
জুনে সামান্য পতনের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদুল আজহার আগে মে মাসে অনেক প্রবাসী পরিবারের জন্য অগ্রিম অর্থ পাঠিয়েছেন। ফলে জুনে পাঠানোর চাপ কিছুটা কমেছে। এছাড়া মাসের শেষ দিনে ব্যাংক হলিডে থাকায় কয়েকটি ব্যাংকের তথ্য এখনও যুক্ত হয়নি। তাই চূড়ান্ত হিসাবে জুনের রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাসিক হিসাবে সামান্য পতন হলেও তা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি।
টানা দ্বিতীয় বছর শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৩.৯১২ বিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০.৩২৯ বিলিয়ন ডলারে। আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৫.৫৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে দেশে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
খাত-বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটানো, ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ডলারের সংকট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রিজার্ভের চাপের মধ্যে রেমিট্যান্স অর্থনীতির অন্যতম বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ, প্রবাসীদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সুবিধা, মোবাইল ও ডিজিটাল চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুযোগ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় বৈধ রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের অবস্থান ধরে রাখা, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে আগামী অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে রেমিট্যান্স নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
সার্বিকভাবে, জুন মাসে সামান্য পতন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছর দেশের রেমিট্যান্স ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। ১৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন রেকর্ড দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।