ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান  বাড়ি, দোকান ও গোয়ালঘরে গোপন করছে জ্বালানি তেল 


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : মার্চ ২৯, ২০২৬, ৯:১০ পূর্বাহ্ণ /
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান  বাড়ি, দোকান ও গোয়ালঘরে গোপন করছে জ্বালানি তেল 

বাড়ি, দোকান ও গোয়ালঘরসহ বিভিন্ন জায়গায় মিলছে মজুদ করে রাখা জ¦ালানি তেলের। এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে মজুদের সাথে জড়িতদের জরিমানার পাশাপাশি কারাদ-ও দিয়েছেন। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে সড়কও অবরোধ করা হয়েছে। শনিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল না কেনার অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। গতকাল থেকে জ্বালানি তেল মজুদ প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজারে অভিযান চালিয়ে ৮০০ লিটার পেট্রল জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব তেল লাইসেন্স ছাড়া অতিরিক্ত মূল্যে খুচরা বিক্রি করার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এনায়েতুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কেন্দুয়ার ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিফাতুল ইসলাম অভিযান পরিচালনা করেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রামপুর বাজারের ব্যবসায়ী এনায়েতুর রহমান পেট্রল অবৈধভাবে মজুদ করে লাইসেন্স ছাড়া অতিরিক্ত দামে খুচরা বিক্রি করে আসছিলেন। খবর পেয়ে সন্ধ্যায় ইউএনওর নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালানো হলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।

এ সময় এনায়েতুর রহমানের গুদামঘরে অবৈধভাবে ড্রামে মজুদ করে রাখা ৮০০ লিটার পেট্রল জব্দ করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা এসব পেট্রল শনিবার সকাল ১০টায় রামপুর বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ও পরিমাণ অনুযায়ী প্রকাশ্যে বিক্রির জন্য কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেন আদালত। এ বিষয়ে কেন্দুয়ার ইউএনও মো. রিফাতুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার জামগড়া মোড় এলাকায় মুদিদোকানি শাহজালালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩৭০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় শাহজালালকে পাওয়া যায়নি। মজুদ করা জ্বালানি তেল পরবর্তী সময়ে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে জামগড়া মোড় এলাকায় শাহজালালের বাড়িতে অভিযানে যান ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাত। বাড়ির একটি ঘরে ৯টি গ্যালনে ৩৭০ লিটার পেট্রল মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়। মুদিদোকানি শাহজালাল মুদিদোকানের পাশাপাশি পেট্রলও বিক্রি করতেন।

কিন্তু মজুদ রেখে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করছিলেন তিনি। ভারপ্রাপ্ত ইউএনও জান্নাত বলেন, মুদিদোকানি নিজ বাড়িতে ৯টি গ্যালনে ৩৭০ লিটার জ্বালানি মজুদ করে রাখেন। অভিযান চালিয়ে সেগুলো জব্দ করে বিক্রি করে টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে। অভিযানের সময় মজুদকারীকে পাওয়া না যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হবে।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ধর্মপুর নীরাবল এলাকায় রাতের আঁধারে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করায় শাহিনুর ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণকে দুই হাজার টাকা জরিমানা ও পাঁচ দিনের কারাদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাত ১০টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইশতিয়াক আহমেদ এ আদালত পরিচালনা করেন। দ-প্রাপ্ত শাহিনুর ইসলাম উপজেলার কালিয়াগঞ্জ গোপিনাথপুর গ্রামের নুরুজ্জামান মানিকের ছেলে। একই সময়ে অবৈধভাবে পেট্রল বিক্রির দায়ে ধর্মজৈন কাতুলিয়াপাড়া গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে (৩৫) দুই হাজার টাকা এবং পার্বতীপুর উপজেলার পশ্চিম বাজিতপুর গ্রামের ইয়ানুস সিয়াম (১৭) নামের এক কিশোরকে এক হাজার টাকা অর্থদ- দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুরে অবৈধভাবে পেট্রল বিক্রির দায়ে তিনজনকে অর্থদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শুক্রবার দিবাগত রাতে বিরল উপজেলার ধর্মপুর এলাকার নীরাবল এলাকায় দিনাজপুরে অবৈধভাবে পেট্রল বিক্রির দায়ে তিনজনকে অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রম পরিচালনাকারী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, স্থানীয়দের ফোনে বিষয়টি জানতে পারি। পরে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা পাই। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, পার্বতীপুর উপজেলা থেকে জারকেনে পেট্রল নিয়ে এসে সীমান্ত এলাকা ফিরলে বেশি দামে বিক্রি করেন তারা। অর্থদণ্ড পাওয়া শাহীনুর কয়েক দিন আগেও একই অপরাধে জরিমানা গুনেছেন দুই হাজার। শুক্রবার রাতে ওই তিনজনকে পেট্রোলিয়াম আইন ২০১৬ অনুযায়ী অর্থদ- ও একজনকে ৫ দিনের জন্য জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

জামালপুর শহরের জুই এন্টারপ্রাইজ নামের জ্বালানি তেলের একটি দোকানে তেল বিক্রি না করার ক্ষোভে সড়ক অবরোধ করেছেন মোটরসাইকেলের চালকেরা। পরে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দোকানে তেলের মজুদ পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি শুরু করায়। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই দোকানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে জিগাতলা এলাকার একটি জ্বালানি তেলের দোকানে তেল কিনতে গিয়ে মোটরসাইকেলের চালকেরা তেল পাননি। বিক্রেতারা তেল নেই বলে জানালে ক্ষুব্ধ চালকেরা জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। খবর পেয়ে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোহেল মাহমুদ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ওই দোকানে তল্লাশি চালিয়ে ২ হাজার ৫০০ লিটার তেলের মজুদ পান তাঁরা। এরপর প্রশাসনের উপস্থিতিতেই তেল বিক্রি শুরু করা হয়।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ বলেন, সড়ক অবরোধের খবরে ঘটনাস্থলে আসি। পরে ওই দোকানের রেজিস্ট্রার দেখি। সেখানে তাদের কাছে তেল নেই দেখা যায়। কিন্তু আমরা দোকানে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ লিটার তেল মজুদ রাখা অবস্থায় পেয়েছি। আমরা ওই তেল আবারও বিক্রির ব্যবস্থা করেছি। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগে জুই এন্টারপ্রাইজকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় একটি গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নে অভিযানটি পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান। ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দার গোয়ালঘরে অবৈধভাবে পেট্রল মজুদ রাখা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, তাঁর পরিবারের এক সদস্য ড্রামে পেট্রল সংরক্ষণ করে বেশি দামে বিক্রি করছিলেন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গোয়ালঘর থেকে পেট্রোলভর্তি ড্রাম ও তেল বিক্রির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত না থাকায় তার পরিবারের অন্য একজন জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের ব্যবহারের জন্য কিছু পেট্রল সংরক্ষণ করা হয়েছিল। শত্রুতাবশতঃ কেউ বিষয়টি প্রশাসনকে অতিরঞ্জিতভাবে জানিয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান বলেন, বসতবাড়ির গোয়ালঘরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পেট্রল মজুদ রাখা হয়েছিল, যা আইনত দ-নীয়। এ কারণে পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ অনুযায়ী জরিমানা করা হয়েছে এবং জব্দ করা মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করা হয়েছে।