

রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে উচ্ছেদ অভিযান নতুন করে জনমনে আশার সঞ্চার করেছিল। পথচারীদের স্বস্তি ফেরাতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছিলেন নগরবাসী। তবে অভিযান শেষ হতে না হতেই আবারো ফুটপাত দখল করে বসছে হকাররা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে এই উচ্ছেদ অভিযান কি শুধুই সাময়িক, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো কাঠামোগত সমস্যা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা ঢাকা শহরকে একটি বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হলে ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই হবে। কারণ একটি শহরের মান নির্ধারণে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযান শুধু সাময়িক সমাধান দিচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই লড়াই এখনো চলমান, এবং এর সমাধান নির্ভর করছে কার্যকর পরিকল্পনা, কঠোর বাস্তবায়ন এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর।
গত সপ্তাহে রাজধানীর নিউমার্কেট, মতিঝিল, গুলিস্তান, গুলশান, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে থাকা অস্থায়ী দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে অনেক জায়গায় ভেঙে ফেলা হয় টং দোকান, ভ্রাম্যমাণ স্টল ও অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা।
তবে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, মতিঝিলসহ রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক এলাকাগুলোতে হকার উচ্ছেদের পর আবারো তাদের ফিরে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নগর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দফায় অভিযান চালিয়ে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আবারো পুরনো চিত্র ফিরে এসেছে। এতে করে একদিকে যেমন পথচারীদের ভোগান্তি বেড়েছে অন্যদিকে নাগরিকদের চলাচলে নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাত দখল করে ভাসমান ব্যবসায়ীরা পুরোনো দিনের মতো আবারো বসে পড়েছেন। গোলাপ শাহ্ মাজারের সামনের রাস্তায় পূর্বে স্থায়ী চৌকি ও ভ্যানগাড়ি বসিয়ে যারা ব্যবসা করেন। হকাররা এখন তাদের চাকা লাগানো দোকানগুলো গুলিস্তান শহীদ মতিউর পার্কে টাকার বিনিময়ে নিরাপদে রাখছেন। উচ্ছেন অভিযান চলে গেলে আবার রাস্তায় বসিয়ে দেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের সমন্বয়ে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম ও মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, যানজট কমানো এবং পথচারীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখা। কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, এই উদ্যোগের ফলে এলাকাগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
অভিযান শেষ হতে না হতেই আবারো ফুটপাত ও সড়কের পাশে বসতে শুরু করেন হকাররা। উচ্ছেদের পরপরই ধীরে ধীরে হকারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বর্তমানে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম ও মতিঝিল এলাকায় গেলে দেখা যায়, ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে আবারো বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। পোশাক, জুতা, মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ, খাবারসহ নানা পণ্য নিয়ে তারা আগের মতোই ব্যবসা করছেন। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে হাঁটার জন্য জায়গা ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন পথচারীরা। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্কদের জন্য এটি ছিল অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ।
তবে অভিযান শেষ হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেখা যায়, অনেক এলাকায় আবারো ফুটপাত দখল করে বসেছে হকাররা। আগের মতোই সাজানো হয়েছে কাপড়, জুতা, ফল, খাবারসহ নানা পণ্য। কোথাও কোথাও আগের চেয়েও বেশি সংখ্যক হকার বসতে দেখা গেছে।
পথচারীরা বলছেন, উচ্ছেদের পর একটু স্বস্তি ছিল, কিন্তু এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সবকিছু। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা না থাকায় মানুষকে বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানী ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যেই আবারো ফুটপাত দখল হয়ে যাচ্ছে হকার, অবৈধ দোকান ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক স্থাপনায়। সমস্যার মূল কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদারকি। শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, যেখানে হকারদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি ফুটপাত ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকবে।
এছাড়া আইন প্রয়োগে দুর্বলতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে ফুটপাত দখল আবার ফিরে আসে। হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে উচ্ছেদ অভিযান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরিফ হাসান বলেন, ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়, যেখানে গাড়ির চাপ খুব বেশি। ফুটপাত দখল ও উচ্ছেদ কয়েকদিনের অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান না হলে পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর বাস্তবায়ন। অন্যথায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই প্রচেষ্টা বারবারই ব্যর্থতার মুখে পড়বে ভোগান্তি পোহাতে থাকবে সাধারণ মানুষ।
বেসরকারি চাকরিজীবী খোরশেদ আলম বলেন, প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। হকাররা এমনভাবে বসে যে চলাচলের কোনো জায়গাই থাকে না। উচ্ছেদ অভিযান হয়, কিন্তু কয়েকদিন পর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। ফুটপাত তো পথচারীদের জন্য। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেটি ব্যবহার করতে পারি না। এতে নিরাপত্তার ঝুঁকিও থাকে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা শহরে হকার নিয়ে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। যখনই উচ্ছেদ করা হয় তার কয়েক ঘণ্টা পরে ফেরত আসে। হকারদের নিয়ে কখনও কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা দেখি নাই। পরিকল্পনা ছাড়া বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযান একদমই লোক দেখানো।
আপনার মতামত লিখুন :