সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ১৩৩ শিক্ষকের ৬৮ জনই অবৈধ নিয়োগ


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : মে ১৯, ২০২৬, ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ /
সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ১৩৩ শিক্ষকের ৬৮ জনই অবৈধ নিয়োগ
  • সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, * বিধি ভেঙে লিজিং কোম্পানিতে এফডিআর * ইচ্ছেমতো দ্বিগুণ হারে দেওয়া হয়েছে বেতন-ভাতা * কোনো খাতে ব্যয়ের সঠিক ভাউচার নেই প্রতিষ্ঠানটিতে

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, হলিক্রসে যেখানে ভর্তি হতে মেয়েদের রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় সেখানে বেইলি রোডেই অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের উল্টো চিত্র।

কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী চার হাজার হলেও বাস্তবে দুই হাজারও উপস্থিত থাকে না। শিক্ষার বদলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, লুটপাট আর দুর্নীতিই যেন প্রতিষ্ঠানটির মূলনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী কমছে প্রতিবছরই। অন্যদিকে থেমে নেই অবৈধভাবে ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার তহবিল নিয়ে অনিয়ম।

আর প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন ১৩৩ জন শিক্ষক, যার মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগই অবৈধভাবে। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, হলিক্রসে যেখানে ভর্তি হতে মেয়েদের রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় সেখানে বেইলি রোডেই অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের উল্টো চিত্র।

কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী চার হাজার হলেও বাস্তবে দুই হাজারও উপস্থিত থাকে না। শিক্ষার বদলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, লুটপাট আর দুর্নীতিই যেন প্রতিষ্ঠানটির মূলনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী কমছে প্রতিবছরই।

অন্যদিকে থেমে নেই অবৈধভাবে ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার তহবিল নিয়ে অনিয়ম। আর প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন ১৩৩ জন শিক্ষক, যার মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগই অবৈধভাবে।

প্রতিষ্ঠানটির নানা অব্যবস্থাপনা উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআই) প্রতিবেদনে। সম্প্রতি এই প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ডিআইএ’র তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল গতমাসে একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের যেসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেছে তা বিস্তারিতভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। প্রতিবেদন আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি, মন্ত্রণালয়ই এখন প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন।

সাহাব উদ্দিন মোল্লা অবৈধভাবে বেসরকারি বেতন বাবদ ৯৭ লাখ লাখ টাকা ও দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন, যা ফেরতযোগ্য। এছাড়া দেলুয়ার হোসেনের নিয়োগ বিধি সম্মত না হওয়ায় আরো প্রায় ৩৮ লাখ টাকা সরকারি কোষোগারে ফেরতযোগ্য হবে।

এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে দুই কোটি ৩২ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ৬৮ জন শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ না থাকায় তাদের নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি। তাদের নিয়োগ বিধি সম্মত না হওয়ায় তারা প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন পাবেন না এবং প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের নেওয়া বেতন-ভাতাও ফেরতযোগ্য হবে।

এছাড়া সহকারী শিক্ষক শামীম আক্তার (শামা) নিয়োগ পরীক্ষার টেবুলেশনসিটে এবং তার এমপিওভুক্তির তথ্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় শ্রেনী উল্লেখ আছে। তবে পরিদর্শনকালে সরবরাহকৃত সনদ যাচাই এ দেখা যায় যে, স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ৩য় শ্রেণি। সঠিক তথ্য গোপন করে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করার জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত তহবিলের সনদ যাচাইয়ে দেখা যায়, ফাস্ট ফিন্যান্স লিজিং কোম্পানিতে পাঁচ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা, পিপলস লিজিং কোম্পানিতে দুই কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৯ টাকা এবং এবং জিএসপি ফিন্যান্স কোম্পানিতে চার লাখ টাকার এফডিআর করা হয়েছে; যা বিধিসম্মত হয়নি। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন করে বিধি মোতাবেক তফসিলি ব্যাংকে এফডিআর করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির জেনারেটর ও লিফট কেনা এবং বিভিন্ন মেরামত কাজ, অভিভাবক শেড নির্মানে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে পরিদর্শন দল। ক্যান্টিন থেকে প্রতিমাসে ভাড়া পেলেও সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।  প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনা ৫টি ল্যাপটপের মধ্যে ২টি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে।

এমনকি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঁচ লাখ দেওয়ার সময় দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলম ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে তিন লাখ ৩৬ হাজার টাকা অবৈধভাবে নিয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটিতে অনুমোদনহীনভাবে প্রভাতী ও দিবা শিফট এবং ইংলিশ ভার্সন চালু আছে। প্রভাতী শিফটে ২৮টি শাখা, দিবা শিফটে ২৬টি শাখা এবং ইংলিশ ভার্সনে ৩০টি শাখা চালু আছে, যার কোন অনুমোদন নেই।

প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করার ঘোষণা প্রচারের জন্য পোস্টার ও লিফলেট ছাপাতে ৭০ হাজার টাকা এবং বিজ্ঞাপন ব্যয় ৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর সত্যতা দেখাতে পারেনি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষা সফর সংক্রান্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্রয় কমিটি, উন্নয়ন কমিটি প্রতিবছরেই কিছু নির্ধারিত শিক্ষকের মাধ্যমে নগদে সম্পাদিত হয়েছে, পিপিআর অনুযায়ী কোন ক্রয় প্রক্রিয়া হয়নি।

১২০ জোড়া বেঞ্চ কেনা এবং   ৫টি বাথরুম নির্মাণে ব্যয় ও মজুরি বিলে শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর রয়েছে, কোন কামিটির সদস্যের স্বাক্ষর নেই। ইংরেজি ভার্সনের মূল্যায়ণ পরীক্ষার কাজগ ও স্টেশনারী কেনা বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ দেখানো হলেও ভাউচার রয়েছে কেবল ২০ হাজার ৯৪৫ টাকার।

এক মাসেরও কম ব্যবধানে ৬০টি সিটি ক্যামেরা কেনা বাবদ ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো, ১ মাস পরেই আবার ৮০টি ক্যামেরা মেরামত বাবদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। ভবনে রং করার জন্য ৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে নরসিংদীর মাধবদি বাজারের ঠিকানায়।

এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির কোচিং বাবদ আদায়কৃত টাকার রশিদ, টাকা ব্যয়ের রেকর্ড পরিদর্শনকালে সরবরাহ করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন বলেন, ‘বেতন-ভাতা নেওয়া, নিয়োগ, কেনাকাটা যা কিছু হয়েছে তা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তেই হয়েছে। এখানে অবৈধভাবে বা অনিয়মের মাধ্যমে কিছু করার সুযোগ নেই।’