জনস্বার্থভিত্তিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকারের কথা জানালেন জামায়াত আমির


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুন ১৬, ২০২৬, ৪:৪১ অপরাহ্ণ /
জনস্বার্থভিত্তিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকারের কথা জানালেন জামায়াত আমির

জনস্বার্থভিত্তিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করলেন জামায়াত আমির।

ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যুতে দেয়া আরেকটি নোটিশের প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টিকে সংবেদনশীল উল্লেখ করে নোটিশ প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হলেও তাদের সদস্য তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

জাতীয় সংসদে গঠনমূলক, যুক্তিনির্ভর ও জনস্বার্থভিত্তিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান।

  • তিনি জানিয়েছেন, অতীতের মতো সরকারঘেঁষা ‘বগলদাবা’ বিরোধী দল কিংবা অকারণ হট্টগোল-ওয়াকআউটনির্ভর বিরোধী দলের ভূমিকায় তারা থাকবেন না। জনগণের স্বার্থের বাইরে সংসদে এক মিনিটও ব্যয় করতে চান না তারা।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংসদ সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা জানান।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদে কার্যকর বিরোধী দল ছিল না। সরকারি দলই কার্যত বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। এমনকি বিরোধী দলের নেতা নির্ধারণের বিষয়টিও সরকারি দলের ওপর নির্ভর করত।

অন্যদিকে আরেক ধরনের বিরোধী দল ছিল যারা সংসদে ফাইল ছোড়াছুড়ি, উত্তেজনাকর আচরণ করে দীর্ঘদিন সংসদ বর্জন করত। জামায়াত এ দুই ধরনের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা বগলদাবা বিরোধী দল হবো না, আবার সংসদের ভেতরে এমন আচরণও করবো না যাতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। জনগণ আমাদের পাঠিয়েছে তাদের কথা বলার জন্য। আমরা ‘রিজনেবল অ্যান্ড লজিক্যাল’ থাকবো।

তিনি বলেন, সংসদে কথা বলার অধিকার সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলের সদস্যদের থাকলেও সুযোগ দেয়ার বিষয়টি স্পিকারের এখতিয়ার।

বিরোধী দলীয় নেতা জানান, তারা সংসদে বেশ কয়েকটি নোটিশ দিয়েছেন। প্রথম নোটিশ ছিল গণভোটে জনগণের দেয়া রায়ের ভিত্তিতে অধিবেশন আহ্বানের দাবি নিয়ে। এ বিষয়ে সংসদে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরার পর দেশের সচেতন মহলও জনরায়কে সম্মান করার পক্ষে মত দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় নোটিশ ছিল ব্যাংকিং খাত নিয়ে। দেশের স্টক মার্কেট প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ব্যাংকিং খাতও ভেঙে পড়ার মুখে। এ বিষয়ে তারা জনগণের পক্ষে সংসদে কথা বলেছেন।

প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে দেয়া তৃতীয় নোটিশের প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষই গঠনমূলক আলোচনা করেছে। তবে শুধু আলোচনা নয়, বাস্তবায়ন জরুরি। এজন্য তারা সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, কিন্তু সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যুতে দেয়া আরেকটি নোটিশের প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টিকে সংবেদনশীল উল্লেখ করে নোটিশ প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হলেও তাদের সদস্য তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরে কার্যসূচি থেকে সেটি বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে বিষয়টি সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ব্যক্তি বা দল নয়, তাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় শুধু দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থ। সংসদের মূল্যবান সময়ও এ দুই বিষয়ের বাইরে ব্যয় করতে চান না তারা।

তিনি বলেন, সংসদের প্রতি মিনিট পরিচালনায় প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তাই ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, দলীয় বিদ্বেষ বা অযথা প্রশংসা-স্তুতির মাধ্যমে জনগণের অর্থ অপচয় হওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে স্পিকারের কাছেও তারা অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাজেট প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বর্তমানে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশন চলছে। গত ১১ জুন বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে এবং ২৯ বা ৩০ জুনের মধ্যে এটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

তিনি অভিযোগ করেন, সম্পূরক বাজেট কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী মার্চ মাসে উপস্থাপনের কথা থাকলেও জুনের মাঝামাঝি তা আনা হয়েছে। ৫৬ হাজার কোটি টাকার সম্পূরক বাজেট খরচ শেষে অনুমোদন নেয়া হয়েছে বলে তিনি সমালোচনা করেন।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আলোচনা শুরুর আগেই সরকারি প্রস্তাবে সমর্থন নিশ্চিত হয়ে যায়। এতে বিরোধী দলের সমালোচনা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, অর্থবছরের শেষ দিকে এক-দুই মাসে বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও দ্রুত ব্যয়ের সংস্কৃতি লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করে। মে মাসের শেষে বরাদ্দ দিয়ে জুনের মধ্যেই ব্যয় শেষ করার বাধ্যবাধকতায় প্রকৃত পরিকল্পনা ও জবাবদিহি থাকে না। বর্ষাকালে তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়িত উন্নয়নকাজের মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এ কারণে অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব দেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বহু দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি বাস্তবসম্মত হবে এবং বর্ষাকালীন অপচয় ও নিম্নমানের কাজ কমাতে সহায়ক হবে।

সাংবাদিকদের সাথে সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে দলের পক্ষ থেকে মুখপাত্র ও একাধিক যোগাযোগ ব্যক্তি নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান ‘সংশোধন’ নয়, ‘সংস্কার’ ছিল জনগণের দাবি এবং গণভোটেরও মূল বিষয়। তাই সংবিধান সংস্কারের জন্য কমিটি গঠন করা হলে তারা বিবেচনা করবেন, তবে সংশোধনের জন্য আলাদা কমিটির প্রয়োজন নেই; সেটি সংসদের স্বাভাবিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে পারে।

‘এটি মিলমিশের সংসদ কি না’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা অকারণ সঙ্ঘাতে যাবেন না, আবার দীর্ঘ সময় সংসদ বর্জনও করবেন না। কোনো যৌক্তিক দাবি উপেক্ষিত হলে ওয়াকআউট করতে পারেন, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদি হবে না।

তিনি বলেন, যদি এটাকে কেউ মিলমিশ বলেন, বলুন; আর যদি এটাকেই সংসদীয় পারফরম্যান্স বলেন, সেটাই আমাদের পারফরম্যান্স।

মতবিনিময় সভায় বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দলটির নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, সাইফুল আলম খান মিলন, শাহজাহান চৌধুরী, গাজী নজরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন ও ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান উপস্থিত ছিলেন।