চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ /
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’
  • ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চীন বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ
    চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠা হলে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান এবং ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমদু চৌধুরী। গতকাল সোমবার আনোয়ারা উপজেলার বেলচূড়া এলাকায় প্রকল্পের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রত্যাশার কথা জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এ শিল্পাঞ্চল শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে এবং শিল্পায়নের শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এখানে এক লক্ষ লোক চাকরি করবে। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হবে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন), সেবাখাত এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসন গড়ে উঠবে। এর সুফল আনোয়ারার গ-ি ছাড়িয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের সাথে সাথে ব্যবসা, চাকরি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে।

জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। সাথে সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে আমরা যাতে আমাদের পরিবেশটা রক্ষা করতে পারি। এখানে শ্রমিকদের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা হবে, সেটা খুব ভালো খবর। শুধু ইন্ডাস্ট্রি না সাথে সাথে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে। আমরা ওই জায়গায় যাচ্ছি। কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছি। আমরা ওই জায়গায় পৌঁছেছি। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে।

এই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়ায় চীনা প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগকে বর্তমান সরকার স্বাগত জানায়। বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আমরা ডিরেগুলেশন নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশ ‘টোয়েন্টিফোর সেভেন’ (২৪/৭) ব্যবসার জন্য প্রস্তুত থাকবে, সে লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। এটাই আমাদের সরকারের ভাবনা।

তাই বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যে কোন পরিবর্তন সবসময় আমাদের চিন্তায় আছে। আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি আমরা বাংলাদেশে ব্যবসার জন্য সিঙ্গেল উইনডো সেবা দিব। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য পূরণে পুঁজিবাজারকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে, চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্বাগত জানান অর্থমন্ত্রী।

চীনা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি চীনা রাষ্ট্রদূতকে আহ্বান জানাই আনোয়ারায় অথবা চট্টগ্রামে একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্যোগী হতে। এতে চীনের বিনিয়োগে ও দেশিয় বিনিয়োগে যে শিল্প গড়ে উঠবে, সেখানে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ সম্ভব হবে। কারণ বাংলাদেশ ও চীনের অংশীদারিত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয় এটি কৌশলগতও। তাই আমরা চাই চীন বাংলাদেশে কৌশলগত বিনিয়োগ করুক। গার্মেন্টস, ওষুধ শিল্প বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ ঠিক আছে। তবে আমাদের সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাতে আরো কৌশলগত বিনিয়োগ প্রত্যাশা করতে পারি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এই প্রকল্প কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রতীক। এর মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারার এই ভূমিতে আজ শুধু একটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের সূচনা হচ্ছে না, বাংলাদেশে শিল্প রূপান্তরের নতুন ইতিহাস রচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় গৃহীত উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন হচ্ছে এই প্রকল্প। সরকার-টু-সরকার কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত এই শিল্পাঞ্চল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি মডেল। ৫০ বছর মেয়াদি, যা আরও ৫০ বছর নবায়নের সুযোগসহ পরিচালিত হবে, এমন কনসেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নির্বিঘœ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করেছে। এর মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন, সহজে ইউটিলিটি সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা পাবেন বিনিয়োগকারীরা।

সরকার জি-টু-জি চুক্তির আওতায় দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সময়মতো, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই শিল্পাঞ্চল স্থানীয় মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করবে। টেকসই শিল্পায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চীন একসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার ছিল, পরে বিনিয়োগ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। এখন দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ-চীনের পারস্পরিক বন্ধুত্বের অন্যতম প্রতীক হবে। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যেই সিইআইজেডে প্রথম কারখানার উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান প্রথমে প্রকল্পটি চালু করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কারখানা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেন। পরে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানও সেই সময়সীমার মধ্যে উৎপাদন শুরু করার প্রদিশ্রুতি দিয়েছে।

আশিক চৌধুরী বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অতিথি। তাদের বিনিয়োগে যেমন শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, তেমনি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করাই সরকারের লক্ষ্য।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান, হুমাম কাদের চৌধুরী, চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানি বেজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

এক দশক পর এই বড় প্রকল্পের যাত্রা শুরুকে স্বাগত জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আলোচনা ও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে গত এক দশক নানা জটিলতায় ঝুলে ছিল প্রকল্প।

শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। আনোয়ারায় সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ নামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সরকারের নিজের অর্থায়ন এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা, আর বাকি দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ দেবে চীন। ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেজা)। এর মধ্যে আছে আধুনিক সড়ক, বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, সিইটিপি, পানি সংরক্ষণাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধাসহ বিশ্বমানের শিল্প অবকাঠামো।