

দেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল: আমরা কি কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের, শিল্পভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হব? এই প্রশ্নের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েই একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে এনেছেন। তিনি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখছেন। এটা শুধু প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকারের ঘোষণা।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় পাঁচশ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আগামী আট বছরে অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। এটি অর্জন করতে হলে শুধু বার্ষিক উচ্চ প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, রফতানির বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সবচেয়ে বড় কথা: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। আর সেই কাজটিই করে যচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়ন সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ, ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা, নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই সরকারকে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হচ্ছে।
অবশ্য ইতোমধ্যে বিশ^ব্যাংক আগামী দিনে তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে বীজ রোপণ করেছে তা বুঝতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৬৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোকে পেছনে ফেলবে। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০৩০ সালে মালয়েশিয়ার জিডিপি ৬৭২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।
অর্থনীতিতে বাংলাদেশ যে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে পেছনে ফেলবে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এর মাধ্যমে ইতোমধ্যে ‘ট্রিলিয়ন’ ডলারের অর্থনীতি রোডম্যাপ কাজ শুরু করেছেন তা বিশ^ব্যাংক আঁচ করতে পেরেছে। তবে দেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মহামুদ চৌধুরী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা এর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। বরং তারা ২ বছরের আগে অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় বা স্থিতিশীল করা সম্ভব নয় এরকম নানাবিধ অসংলগ্ন কথা বলে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন।
অথচ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ঘিরে উন্নয়ন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাপক কর্মকাণ্ড স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন পূরণ আরো একধাপ এগিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- আনোয়ারায় চীনের শিল্প জোন, কোরিয়ান ইপিজেড, মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্র বন্দর, জ্বালানি হাব, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল, বে টার্মিনাল, মীরসরাই শিল্পনগর চট্টগ্রামকে উন্নয়ন বিনিয়োগের আঞ্চলিক এবং লজিস্টিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। এর ফলে লাখো মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিল্প বিপ্লবে বদলে যাবে দেশের অর্থনীতি। বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পর্যটন নগরায়নে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। সেই সাথে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাবে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে দেশের কৃষি ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে এবং নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিতে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুরের কৃষিনির্ভর জেলাগুলোতে বেকারত্ব দূর করতে এবং কৃষিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির রূপান্তরে উত্তরাঞ্চলের এই কৃষি বিপ্লব ও কৃষিনির্ভর শিল্পায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উন্নয়ন বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগের যে সম্ভাবনা তা দ্রুত কাজে লাগাতে দরকার টেকসই জ¦ালানি ব্যবস্থা। জ¦ালানি খাতে যে সংকট তা দ্রুত নিরসন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। তবে সাম্প্রতিক গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার খেসারত দেশের শিল্প কারখানাগুলোকে দিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন বলেও মনে করেন ভুক্তভোগী শিল্প কারখানার মালিকেরা। টেকসই জ¦ালানি ব্যবস্থার জন্য এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসকূপের সরবরাহ বাড়ানো, নতুন নতুন কূপ খনন এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সমুদ্রসম্পদের ব্যবহার নিশ্চিতে সাগরেও তেল, গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় এবং রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। পরিবর্তিত বিশ^ রাজনীতি এবং অর্থনীতির যে গতিধারা তাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য বাংলাদেশ তথা বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল। চীনের অর্থনৈতিক করিডোর দ্রুত বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে। জিডিপির আকার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। মক্কা চুক্তির বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করছেন বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, এ জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তুরস্ক, সউদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে, বিনিয়োগ আসবে। বর্তমান জনশক্তি রফতানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে সেসব দেশে আরো ব্যাপক হারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তুরস্কে নতুন বাজার তৈরি হবে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে। একই সঙ্গে সরকার তার কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে ইউরোপীয় ইউনয়িন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
এদিকে উন্নয়ন সহযোগী চীন, জাপান ও কোরিয়া বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের জন্য উদগ্রীব। যদিও এ জন্য তাদের চাওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশের দ্রুত সংস্কার। বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব থেকে বের হতে হবে বাংলাদেশকে।
যদিও বিশ^ব্যাংকের পূর্বাভাস ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর অংশ হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের রূপরেখা বাস্তবায়নে এখনও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অর্থ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ-জ¦ালানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বেফাঁস মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের উচিত হবে আগামী দিনের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে যৌক্তিকভাবে মানুষকে সেই স্বপ্ন দেখানো। অথচ এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী তাদের কাজ বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
এছাড়া দেশের অর্থনীতির লাইফ-লাইন যোগাযোগ ব্যবস্থারও বেহাল দশা। ঢাকাণ্ডচট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩২ ঘণ্টা ধরে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী ও চালক। যানজটে আটকা পড়ে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে অ্যাম্বুলেন্সেই আমিরুন্নেছা নামে হৃদরোগে আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ যানজটের কারণে সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছতে না পেরে ফ্লাইট মিস করেছেন কয়েকজন বিদেশগামী যাত্রী।
শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত কুমিল্লার চান্দিনা থেকে নারায়ণগঞ্জের আষাড়িয়ারচর ব্রিজ পর্যন্ত ঢাকামুখী লেনে এ যানজট স্থায়ী হয়। এ খাতের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম-প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবও ব্যর্থতার বৃত্তে আছেন। বছরব্যাপী সড়কের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেই। সড়কের বেহাল দশা নিরসনে তাদের নেই কোনো উদ্যোগ। এমনকি এবারও অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ১ শতাংশের কম।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে জুলাইয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপির ২ হাজার ১২১ দশমিক ১৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা মোট বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুসারে, গত জুলাই মাসে খরচের খাতা খুলতে পারেনি অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার শূন্য ছিল এমন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা ১০টি।
অপরদিকে অর্থনীতির আরেক লাইফ লাইন বিদ্যুৎ-জ¦ালানি খাতও নানাবিধ চাপে বিপর্যস্ত। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের প্রভাবে শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকার কিছু বাস্তব সমস্যার মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এর মধ্যে প্রধানতম সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালীর সংকট। তেল-গ্যাস আমদানির বেশ কিছু চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত দামে স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ভর্তুকি বাড়ছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোয় দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণী পদে অভিজ্ঞ ব্যক্তির অভাব। এর একটা বিরূপ প্রভাবও সৃষ্টি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। এর ফলে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার মানসিকতায় ভাটা পড়েছে এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে। এছাড়া গত দুই বছরে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র যথাসময়ে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি এমন অভিযোগও রয়েছে।
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার এসে সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করার কারণে অনুসন্ধান ও উত্তোলন এবং জ্বালানি খাতে একটা স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে। আর তাই নানাবিধ সংকটের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের জ¦ালানি সংকটের মধ্যেও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ২২২ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। বিবিয়ানার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৪০০ মেগাওয়াটই উৎপাদন করা হচ্ছে। তিতাস পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট, এর মধ্যে ৩৯ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় ইতোমধ্যে উৎপাদনেও বড় পরিবর্তন এসেছে।
গতকালের তথ্য মতে, ১৪ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদা রয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। অবশ্য নানাবিধ পদক্ষেপে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে। যদিও দেশের বর্তমান মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ)। এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হলে দেশে জ¦ালানি সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব।
বিশ্লেষকদের অনেকেই অতীতের সরকারের নীতি এবং দুর্ঘটনার দায়ের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান তীব্র লোডশেডিংয়ের জন্য একদিকে জ্বালানি সংকট অন্যদিকে সরকারের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দুটোই দায়ী।
তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি মেরামত হয়েছে কিন্তু এখন গ্যাস আমদানি কার্গো আসতে সমস্যা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের জন্য বিদ্যুৎ বিল এককালীন না দিয়ে বারো মাসের কিস্তিতে দেয়ার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শিল্প কারখানার জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস বাঁচাতে এবং গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি সর্বোচ্চ করতে বলা হয়েছে।
ভোলা থেকে গ্যাস আনতে পাইপালাইন করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে, এটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। দেশীয় উৎস থেকে ১৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের সময় জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে এটিও বর্তমান সংকটের একটা কারণ বলে দাবি করেন উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আমরা জনগণের ক্রাইসিসের প্রতি সমব্যথী তবে একই সঙ্গে এ কথাটা বলতে চাই- এই সংকটটা বহু বছরের পুঞ্জিভূত সমস্যা। একই সঙ্গে মোটা দাগে কিছু অদক্ষতা সমস্যা আছে। মূলত যুদ্ধটাই এ সংকটের কারণ।
চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, কৌশলগত ভৌগোলিক সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তার পুরোটাই কাজে লাগানো শুরু করেছে সরকার। এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন সফল হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে বিশ^ দরবারে ব্র্যান্ডিং করতে হবে।
ইতোমধ্যে লালদিয়া টার্মিনালে বিশ^খ্যাত অপারেটর এপিএম টার্মিনালস বিশাল বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছে। তাদের এ বিনিয়োগ বিশ্ব দরবারে চট্টগ্রাম বন্দর এবং বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আরো বেশি বাড়বে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অবশ্যই দ্রুতসময়ে জ¦ালানি সংকটের অবসান করতে হবে। শাহ আমানত বিমানবন্দরকে কার্গো ভিলেজসহ অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধায় সমৃদ্ধ করতে হবে। ঢাকাণ্ডচট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সূত্র মতে, নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর বিগত ১৭ বছরে সীমাহীন লুটপাট, দুর্নীতি আর অর্থপাচারে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে তিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পথে দ্রুত সব জটিলতার অবসান করেন। আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। ওই শিল্প জোনে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে। কয়েকশ’ কারখানায় কর্মসংস্থান হবে লাখো মানুষের। আগামী এক বছরের মধ্যে শিল্প কারখানা চালুর লক্ষ্যে এ শিল্প জোনে অবকাঠামো নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। একই এলাকায় দেশের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ বেসরকারি ইপিজেড কোরিয়ান ইপিজেডেও ব্যাপক বিনিয়োগ আসছে।
কোরিয়ান ইপিজেডের একজন কর্মকর্তা জানান, সেখানে এখন এক বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে, আরো বিনিয়োগ আসছে। কোরিয়ান বিনিয়োগকারীরা ওই ইপিজেডে আরো বেশি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কর্ণফুলী টানেলসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোরিয়ার সাথে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশে কোরিয়ান বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। মীরসরাই শিল্পনগরেও কল-কারখানা চালুর প্রস্তুতি চলছে। কল-কারখানা ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে অনেক কারখানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বেশ কয়েকটি কারখানা উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ-বেপজার সাথে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষর করছে। সম্প্রতি এলইডি পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে মীরসরাইয়ে এক কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগে কারখানা স্থাপনে বেপজার সাথে চুক্তি করেছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ইকোলেট (প্রাইভেট) লিমিটেড। এ অঞ্চলে চীন-কোরিয়ার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চরে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালস প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এ প্রকল্পের আজ রোববার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ঘিরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নও এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে কর্ণফুলী টানেল চালু হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, আউটার রিংরোডসহ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বন্দর সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের কাজও চলছে। বে টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের সক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জাপানের কাশিমা বন্দরের একই আদলে বহু সুবিধাসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজও এগিয়ে চলছে। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ¦ালানি নিশ্চয়তা। এ লক্ষ্যে মহেশখালীর কুতুবজোমে চীনা বিনিয়োগে আরো একটি এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগে থেকেই মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ জ¦ালানি হাব রয়েছে।
কক্সবাজারের সাথে আনোয়ারা কর্ণফুলী টানেল হয়ে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পূর্ণাঙ্গ কার্গো ভিলেজ প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের নানা উদ্যোগ আর অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে টেকনাফ থেকে ফেনী পর্যন্ত বিশাল সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় শিল্পায়ন, পর্যটন, আবাসন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন বিনিয়োগ আসছে। উপকূলীয় এলাকার এ বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করতে মীরসরাই-সীতাকু- থেকে নগরীর কাট্টলী-হালিশহর-পতেঙ্গা হয়ে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া-চকরিয়া-মহেশখালী মাতারবাড়ী পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভওয়ে (সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ) নির্মাণ করা অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত লিখুন :