

প্রথমে ইউক্রেন ও পরে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কট এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতির ফলে দেশে যে মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে। দেশের নানামুখী রাজনৈতিক সঙ্কট এবং করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে সাফল্য, তার মৌলিক জোগান এসেছে উত্তরের কৃষি থেকেই।
অথচ পরিতাপের বিষয়, দেশের রাজনৈতিক প্লাটফর্মে কিংবা জাতীয় সংসদের বিতর্কে এই বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের যুদ্ধ ও সহিংসতার জেরে তৈরি হওয়া নাজুক অর্থনৈতিক সঙ্কটের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনা, সমালোচনা বা সমাধানের কোনো সূত্র কি রাজনৈতিক উপস্থাপনায় পাওয়া যায়? সিনিয়র সিটিজেন ও উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, কৃষিভিত্তিক উন্নয়নই বর্তমান রাজনীতির প্রধান চর্চিত বিষয় হওয়া উচিত ছিল।
উত্তরাঞ্চলের একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক অধ্যাপক আবু হায়দার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য দিয়ে জানান, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম প্রান্তিকেই বিশ্ববাজারে গম, ভোজ্যতেল ও পেট্রোলিয়াম সামগ্রীর দাম ২.৪ শতাংশ বেড়েছে। ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল কেন্দ্রিক সঙ্ঘাত না থামলে এই দর আরও বাড়বে। যার অনিবার্য প্রভাবে বাংলাদেশেও চিনি, তেল ও গমের দাম বৃদ্ধি পাবে; এমনকি সাধারণ চালের কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থবিদদের মতে, ৩৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের বিপরীতে এই আমদানি ব্যয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই চাপ সামলাতে রফতানি আয় বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষাবিদ ড. তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বর্তমানে সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে জুন পর্যন্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। তবে ভূ-রাজনীতি আরও অস্থিতিশীল হলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় এখনই জাতীয় ঐক্যমত্য প্রয়োজন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বিদ্যুৎ ও শিল্প সচল রাখতে সরকারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই ব্যয় নির্বাহে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি ও কৃষি পণ্য রফতানি নিশ্চিত করা জরুরি। বগুড়া জেলা চেম্বারের একজন নেতা এবং বিএনপির সাবেক শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক মাহফুজ সিদ্দিক লিটন জানান, শহীদ জিয়াউর রহমান জনশক্তি রফতানি ও গার্মেন্টস খাতকে শক্তিশালী করে অর্থনীতির ভিত্তি গড়েছিলেন। এরপর তিনি কৃষি, মৎস্য ও পোল্ট্রি খাতকে রফতানিমুখী করার উদ্যোগ নেন। তবে তার শাহাদাতের পর এই সম্ভাবনাময় খাতের দিকে পরবর্তী কোনো সরকারই যথাযথ নজর দেয়নি।
লিটন আরো জানান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স), নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের শীতকালীন ফসলের বিপুল চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মূলার বাজার ধরা সম্ভব হলে উত্তরাঞ্চল হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৃষি হাব। অথচ রফতানির জন্য এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারপোর্ট বা কার্গো সুবিধা আজও নিশ্চিত করা হয়নি।
দেশের শষ্যভা-ার খ্যাত উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর দুই মৌসুমে ধান, আলু, ভুট্টা, সবজি, আম, কাঁঠাল ও লিচুর বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। সৃষ্টিকর্তা যেন দু’হাত ভরে এই অঞ্চলের মাটিতে বরকত ঢেলে দেন কৃষকদের জন্য। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই ফলন পেয়েও হতাশ হতে হয় কৃষকদের। এবছরই উত্তরাঞ্চলে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত উৎপাদনের পরও বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদন খরচই তুলতে পারেননি কৃষকরা। ফলে কোথাও কোথাও গো-খাদ্য কোথাওবা পচে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার মন আলু।
ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার আলু চাষি মমতাজ উদ্দিন সুমন বলেন, এবছর তিন ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। প্রতি বিঘা আলু চাষে তার খরচ হয়েছিল ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকার মতো। আলুর ফলন হয়েছে পর্যাপ্ত। কিন্তু মাঠ থেকে আলু উত্তোলনের পর তিনি উৎপাদন খরচই তুলতে পারেননি। যেখানে প্রতি বিঘা আলু চাষে ব্যয় হয়েছে ৩০-৩২ হাজার টাকা সেখানে তিনি আলু বিক্রি করেছেন ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। প্রতি কেজি আলুর দাম পেয়েছেন ৯ টাকা দরে।
সুমন আরো জানান, শুধু তারই নয়, ওই এলাকার অন্যান্য আলু চাষিদেরও একই অবস্থা। সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা না থাকা এবং ক্রেতার অভাবের কারণে প্রচুর পরিমাণ আলু পচে নষ্ট হয়েছে, আবার অনেকে গরু-ছাগলকে খাইয়েছে।
একই উপজেলার কৃষক তাজুল ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, প্রতিছরই কোন না কোন ফসল নষ্ট হয় কেবল যথাযথ বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়া না থাকার কারণে। কোন বছর আলুর ভালো ফলন হলে আলু নষ্ট হয়, কোন বছর ফুলকপি নষ্ট হয়, কোন বছর তরমুজত তো কোন বছর আম, ভুট্টা। অথচ এগুলো যদি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তাহলে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এতে দেশ যেমন খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ হবে একইভাবে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলো। সেটি করা সম্ভব হলে উত্তরাঞ্চলই হবে দেশের অর্থনীতির হৃৎপি-।
পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও রফতানি সুবিধার অভাবে কৃষক ও হিমাগার মালিকরা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। অথচ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো তাদের কৃষি চাহিদার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানে টমেটোর যে বিপুল চাহিদা, তার বড় অংশ উত্তরের ১৬ জেলা থেকে জোগান দেওয়া সম্ভব ছিল। বর্তমানে এখানে ৩ কোটি ৭৯ লাখ মানুষের চাহিদার বিপরীতে কেবল বোরো মৌসুমেই উৎপাদন হয় ৭২ লাখ মেট্রিক টন চাল। আমন ও আউশ মিলিয়ে উৎপাদন আরও ৫০ লাখ টন।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, উত্তরাঞ্চলে বছরে আলুর উৎপাদন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা মাত্র ১৭ লাখ টন। উদ্বৃত্ত এই বিপুল আলু রফতানি করা গেলে কৃষি অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটত। এছাড়া দিনাজপুর ও রংপুরের লিচু ও আম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর ফুল এবং সরিষা উৎপাদনের আধুনিকায়ন করলে সয়াবিন তেলের আমদানি ব্যয় বহুগুণ কমানো সম্ভব।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ডের মতো কর্মসূচি দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ হলেও সামগ্রিক জিডিপির উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনীতির চাকা সচল করতে হলে উত্তরাঞ্চলকে একটি রফতানিমুখী কৃষি হাবে পরিণত করতে হবে। তবেই খুলবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কাক্সিক্ষত স্বর্ণদ্বার।
আপনার মতামত লিখুন :