এবার তেল রপ্তানি বন্ধের কঠোর হুঁশিয়ারি দিল ইরান


Sarsa Barta প্রকাশের সময় : আগস্ট ২৫, ২০২৬, ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ /
এবার তেল রপ্তানি বন্ধের কঠোর হুঁশিয়ারি দিল ইরান
  • হরমুজে নিয়ম অমান্য করলে বাজেয়াপ্ত করা হবে জাহাজ * সব অর্থনৈতিক সব লাইফলাইন কেটে দেওয়া হবে: স্কট বেসেন্ট * যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি চীনের * মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত রাশিয়া * লোহিত সাগরে সউদী তেলের ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ অব্যাহত থাকলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ দিয়েই এক ফোঁটা তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই। রোববার (২৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন।

রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি তো নয়ই, পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো স্থান থেকেও তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযানে কোনো দেশ অংশ নিলে বা তেহরানের বিরুদ্ধে ওই উদ্যোগকে সহযোগিতা করলে ইরান সেটিকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।. ইরানের এই হুঁশিয়ারি এসেছে ওয়াশিংটনের নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতির মধ্যে। ওয়াশিংটন এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এর আগে ইরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সহযোগিতা করা প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করেছিলেন। রেজাই শনিবার বলেছিলেন, কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নিলে তাদের স্বার্থে আঘাত করা হতে পারে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বন্ধের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে, ‘হরমুজ প্রণালী’ অতিক্রমের ক্ষেত্রে নির্দেশিকা না মানলে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা, আটক কিংবা পণ্যসহ জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল ইরান সরকারের নতুন গঠিত ‘পার্শিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও শিপিং সংস্থাগুলোকে এই সংক্রান্ত সতর্কবার্তা প্রদান করে। সংস্থাটি জানায়, ইরানি বিধিমালা লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে পরবর্তী যাতায়াতের সময় চরম আইনি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পারস্য উপসাগরে পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজ ভাড়া করার আগে যেকোনো কোম্পানিকে অনিয়মকারী বা নিয়ম ভঙ্গকারী জাহাজের হালনাগাদ তালিকাটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তালিকায় থাকা জাহাজের সাথে কোনো প্রকার সহযোগী কার্যক্রমে লিপ্ত হলে (যেমন: সমুদ্রে পণ্য আদান-প্রদান বা শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার) সংশ্লিষ্ট অন্য জাহাজকেও সঙ্গে সঙ্গে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই জলপথে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে ইরানের সর্বশেষ হুমকি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও তেল রপ্তানি নিয়ে ধারাবাহিক হুঁশিয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। এতে দুই দেশের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

সব অর্থনৈতিক সব লাইফলাইন কেটে দেওয়া হবে : ইরানের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং তাদের অর্থনীতির সব পথ বন্ধ করে দিতে এবার ‘সর্বকালের কঠোরতম’ আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরানকে টিকে রাখার জন্য ব্যবহৃত ‘প্রতিটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দেওয়াই’ তাদের প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে এক অভূতপূর্ব ‘অর্থনৈতিক ইকোনমিক ডি-ডে’ বা সর্বাত্মক আর্থিক আক্রমণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বেসেন্ট। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত ঘোষণা আসার পূর্বেই তিনি সাংবাদিকদের জানান, নতুন এই বিধিনিষেধের মাধ্যমে ইরানি প্রশাসনকে একেবারে একঘরে করে দেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ট্রেজারি সচিব জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে সব মার্কিন সংস্থা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ বা গোষ্ঠী এখনও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রেখে তাদের টিকে থাকার রসদ যোগাচ্ছ বিশেষ করে জ্বালানি তেল ক্রেতারা তাদেরও মার্কিন পদক্ষেপের পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি চীনেরঃ ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তীব্র করার পদক্ষেপ এবং ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রস্তুতির জবাবে চীন স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের আইনানুগ স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন তা-ই করবে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে সংঘাত এড়িয়ে সব পক্ষকে যৌক্তিক আচরণ ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞা বা চাপের কৌশল আন্তর্জাতিক সংকট বা সমস্যার সমাধান করতে পারে না।’

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের সমর্থনে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরান ও তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আনা হবে। ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অংশীদার হিসেবে চীন বারবারই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। এর আগে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দেয়, যেসব দেশ ইরানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখবে তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়ার এই প্রচেষ্টা এবং অন্যদিকে চীনের নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষার ঘোষণাÑমধ্যপ্রাচ্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীন-মার্কিন কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত রাশিয়া : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রয়োজন হলে মধ্যস্থতার উদ্যোগে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার আলিমভ গতকাল এ কথা জানিয়েছেন। রুশ সংবাদমাধ্যম ইজভেস্তিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলিমভ বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের পক্ষ থেকে অনুরোধ এলে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে মস্কো। রাশিয়ার প্রস্তাবিত পারস্য উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর হালনাগাদ ধারণার মধ্যেও এ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।

আলিমভের মতে, লেবাননের পরিস্থিতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির পাশাপাশি লেবাননকে ঘিরে সংকটও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সম্ভাব্য যেকোনো সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামনে এনেছে। তার ভাষ্য, ইসরাইল কোনো চুক্তির অংশ হলে তা সরাসরি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হতে পারে।

লোহিত সাগরে সউদী তেলের ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : লোহিত সাগরে সউদী আরবের ইয়াঙ্কু বন্দর নগরী থেকে প্রায় ৬৩ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত প্রক্ষেপক বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে জাহাজটির মূল ডেকে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (ইউকেএমটিও)। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘মেরিস্কস’-এর তথ্যমতে, হামলার শিকার জাহাজটি সম্ভবত সউদী পতাকাবাহী অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ‘আমজান’। জাহাজটি সউদী আরবের শীর্ষ জাতীয় জাহাজ ও লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান ‘বাহরি’-র মালিকানাধীন।

দুর্ঘটনার সময় ট্যাংকারটি ট্র্যাকিং সিগন্যাল (ট্রান্সমিশন) বন্ধ রেখে লোহিত সাগর দিয়ে দক্ষিণ দিকে অতিক্রম করছিল। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এই হামলা চালিয়েছে বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রাথমিক ধারণা করছেন, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। ইউকেএমটিও নিশ্চিত করেছে যে, জাহাজে আগুন লাগলেও সব ক্রু ও নাবিক সুরক্ষিত আছেন এবং বড় ধরনের কোনো পরিবেশগত ক্ষতির (তেল ছড়িয়ে পড়া) তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র : আল-জাজিরা, রয়টার্স, মেহের নিউজ, তাস।