

দেশে তীব্রতর হচ্ছে জ্বালানি সঙ্কট। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি কোন দিকে যায়- জনমানুষের কপালে সেই চিন্তার ভাঁজ। জ্বালানির দাম না বাড়তেই বল্গাহীন দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া। রিজার্ভ কমছে। বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ নেই। শেখ হাসিনা সরকার আর্থিক সেক্টর ফোকলা করে দিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারও ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে সোজা করতে পারেনি। শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের সংখ্যা ৫০ লাখ ছুঁই ছুঁই। অনিশ্চিত হতে চলেছে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বৈদেশিক শ্রমবাজার। শিক্ষায় ফেরেনি শৃঙ্খলা। প্রশাসনের পুনর্বিন্যাস নিয়ে রয়েছে হাজারো প্রশ্ন। হার বাড়ছে দুর্নীতির। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া কৃষকের মুখে চিন্তার বলিরেখা। একই চিত্র ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে। ব্যাটারিচালিত রিকশা শহরগুলোতে স্বাভাবিক চলাচলের পথ কলাপস করে দিচ্ছে। বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ ইস্যুটিও হয়ে আছে ‘কাজীর গরু’র মতো। খাতায় আছে, গোয়ালে নেই।
পরিবর্তন বা স্বস্তি আসেনি কোনো একটি সেক্টরে। এমন ঘটমান ও জ্বলজ্যান্ত ইস্যু নিয়ে টুঁ শব্দটি নেই। নির্বাচন-পূর্ব সেই তত্ত্বগত এবং আপাত অপ্রাসঙ্গিক বিষয়-আশয় নিয়ে সংসদ গরম করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলা নিয়ে সরকার কেন জোরালো প্রতিক্রিয়া জানালো না- এ জন্য কোনো কৈফিয়তের কাঠগড়ায়ও দাঁড় করানো হয়নি সরকারকে। অথচ আপাত অপ্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে নিত্যদিন তোপের মুখে রাখা হয়েছে সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চকে। তাই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতের দায়-দায়িত্ব নিয়ে। তাদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নিয়ে। তারা কী তাদের দলীয় এজেন্ডা ‘সংবিধান সংস্কার’ ‘গণপরিষদ’-এর মতো সাংবিধানিক ঘেরাটোপের মধ্যেই ঘুরপাক খাবে? নাকি জাতীয় সঙ্কট ও নিত্য নাগরিক দহন যন্ত্রণা প্রতি মনোযোগী হবে?
এ মুহূর্তে ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে দেশ। নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বহু চ্যালেঞ্জও। দেশের ব্যাংকিং খাত এখন বড় ধরনের মূলধন ও তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। অন্তত ২৩টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। বেশ কিছু আর্থিক নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে অবসায়নের পথে। অবসায়নের পথে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানিকৃত জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো চাহিদামতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, যা শিল্পোৎপাদন ও জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গত দেড় দশকে দেশ থেকে বিপুল অর্থ (প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি বড় ক্ষত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম। এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। আমদানিনির্ভর পণ্যের মূল্য বেড়েই চলেছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে ত্রুটির কারণে এই সঙ্কট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন ডলারের তীব্র সঙ্কটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে মন্থর করে দিয়েছে। এসব নিরসনে সরকার দাতা সংস্থা এবং অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে ডাকাতি, ছিনতাই বেড়েছে। মহাসড়কগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত দুুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে জাতীয় সংসদে জামায়াত কোনো কথা বলছে না। শরিকসহ দলটি পড়ে আছে ‘গণভোট’, ‘সংবিধান সংস্কার’, ‘গণপরিষদ’ নিয়ে।
বিরোধী দল বিরাজমান সঙ্কট ও বাস্তবতা থেকে কতটা দূরে অবস্থান করছে, সেটির দৃষ্টান্ত টানতে গত ৩১ মার্চের সংসদে অনুষ্ঠিত পার্থ-বনাম এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর মধ্যকার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যগুলোই প্রকৃষ্ট। ওই দিন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এমপি এবং জামায়াত-জোটসঙ্গী এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর মধ্যে বাহাত্তরের সংবিধান ও গণভোট ইস্যুতে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। বিতর্কটি হয় ‘সংবিধান’ ও ‘গণভোট’ নিয়ে। পার্থ বাহাত্তরের সংবিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
গণভোট ও ‘জুলাই সনদ’ ইস্যুতে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি জানতে চান, ৫ আগস্টের পর কেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তে বিপ্লবী সরকার গঠন করা হয়নি?
জুলাই সনদ নিয়ে তাদের দলের মৌলিক কোনো আপত্তি নেই; বরং আপত্তি রয়েছে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে। শুরু থেকেই বিএনপিকে ‘জুলাইয়ের বিরুদ্ধে’ দাঁড় করানোর একটি প্রচেষ্টা সম্পর্কে। ব্যারিস্টার পার্থ বলেন, ট্রেজারি বেঞ্চে বসা অনেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ ছিলেন। কারাবরণ করেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের অবদান সবার হলেও, জুলাইয়ের কৃতিত্ব এককভাবে দাবি করা ঠিক নয়।
বিরোধী দলের (জামায়াত) উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, আপনারা তখন বিপ্লবী সরকার গঠন করলেন না কেন? নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে পারতেন। পুরোনো সংবিধানের মধ্যে থেকে সেটিকে বাতিলের চেষ্টা যৌক্তিক নয়।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন পার্থ। তিনি বলেন, সংবিধান নিয়ে এত গাত্রদাহ কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় যে, এটি একাত্তরে পরাজয়ের দলিল?
গণভোটের কাঠামোগত সমালোচনা করে তিনি বলেন, একাধিক বিষয় একসঙ্গে ভোটে দেয়ায় ভোটারদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়েছে। কোনো একটি বিষয়ে দ্বিমত থাকলে ভোটার কীভাবে মত দেবেন, সেই প্রশ্ন তোলেন পার্থ।
জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব এককভাবে নেয়ার চেষ্টার সমালোচনা করে বলেন, আপনারা জেন-জি রিপ্রেজেন্ট করেন, জামায়াত জেনারেশন হইয়েন না। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার পাশাপাশি জুলাইয়ের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। বিপরীতে আক্রমণাত্মক ভাষায় কড়া জবাব দেন কুমিল্লা-৪ আসনের এমপি ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। সরকারি দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা কখনো কখনো কনফর্মিস্ট, কখনো কখনো রিফর্মিস্ট, তারা মূলত অপর্চুনিস্ট। আমি সংবিধানের কিছু কিছু ধারা মানব, আর কিছু কিছু ধারা মানব না। আমি কখনো কখনো সাংবিধানিক, কখনো কখনো অসাংবিধানিক।
জনাব পার্থ যারা সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায় তাদের স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে তুলনা করলেন। তখন ট্রেজারি বেঞ্চে সম্মানিত মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিলেন। গণতন্ত্রের জন্য যিনি আপসহীন লড়াই করে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া…তিনি বলেছিলেন, যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন এই পার্লামেন্ট জনতার কাছে যাবে, সেদিন এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চে যারা…তারা দীর্ঘদিন খালেদা জিয়ার সাথে রাজনীতি করেছেন। এখন তারা সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নকে স্বাধীনতা-বিরোধীদের সঙ্গে এক করে দেখার মাধ্যমে কী বেগম জিয়াকেই পরোক্ষভাবে অসম্মান করছেন কি-না, তাদের সেটি ভেবে দেখা উচিত।
জনাব পার্থ বলেছেন, বাহাত্তরের সংবিধানের কিছু কিছু বিষয়কে উনারা সম্মান দিয়েছেন। তার মানে কিছু কিছু বিষয়কে উনারা সম্মান দেননি। তার মানে, এই অভ্যুত্থানের পরে সংবিধানের কিছু অংশ উনারা মেনেছেন, কিছু অংশ উনারা মানেননি। উনারা কেবল ওই অংশই মেনেছেন যেটি উনাদের পক্ষে গেছে। যেই অংশটা উনাদের বিপক্ষে গেছে সেটি উনারা মানেননি। জামায়াত জোটের সঙ্গী এই তরুণ নেতা সেদিন এমন অনেক কথাই বলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যা বিদ্যমান জাতীয় পরিস্থিতি সাপেক্ষে শুধু অপ্রাসঙ্গিকই নয়-বিরক্তিকরও বটে। অথচ দেশের মানুষ তাদের সংসদে পাঠিয়েছেন জাতীয় সঙ্কট নিয়ে কথা বলার জন্য। সংসদের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। এক মিনিট সংসদ পরিচালনায় জাতির খরচ হয় দুই লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। এ ব্যয় ভার বহন করছে দেশের মানুষ। অথচ সংসদে মানুষের কথা নেই। মানুষ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করছে, সংসদে আলোচনার বিষয়বস্তুগত খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বিশেষত বিরোধী দলের ভূমিকায় মানুষ হতাশ। জামায়াত-এনসিপি কথায় কথায় আবার রাজপথে নামার হুমকি দিচ্ছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের আওতায় নির্বাচন করে বিরোধীদলীয় আসনে বসে জামায়াত জোট সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চাইছে। সংবিধানের সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কার চাইছে। এমনটির সমালোচনা করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনজিল মোরসেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেগুলো আইন আকারে পাসের জন্য উত্থাপন করা হয়েছে। ‘গণভোট’সহ অনেক অধ্যাদেশ রয়েছে সেগুলোর আর পরবর্তী কার্যকারিতা নেই। এমন অধ্যাদেশ রয়েছে যেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপস হয়ে যাবে। যেসব ইস্যুতে গণভোট হয়েছে সেগুলোর বেশ কয়েকটির বিষয়ে বিএনপি তার আপত্তি জানিয়ে আসছে শুরু থেকেই।
আমাদের নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা, জুলাই সনদে স্বাক্ষরের আগে বিএনপি কোন্ কোন পয়েন্টে নোট অব ডিসেন্ট দেবে- এটি কিন্তু আলোচনা হয়েছে। পরে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর হয়েছে। তাহলে সংবিধান সংস্কার বা ‘গণপরিষদ’ বিল বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, বিএনপি এখন কেন করতে যাবে? জনগণ তো এ জন্য তাদের পক্ষে রায় দেয়নি। মানুষ রায় দিয়েছে বিএনপির পক্ষে। বিএনপি তাদের এজেন্ডায় পরিষ্কার ভাষায় ‘গণপরিষদ’ ইস্যুতে দ্বিমত পোষণ করেছে। বিএনপি এখন ক্ষমতায়। তাহলে এ দল কেন জামায়াত-এনসিপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে? আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের আগে ‘গণভোট অধ্যাদেশ আইন’ সংসদে উত্থাপন করা হবে না- মর্মে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল বিএনপি। ফলে অধ্যাদেশটি আগামী ১২ এপ্রিল স্বয়ংক্রিভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, গণপরিষদ অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেয়া সংস্কারমূলক প্রস্তাবগুলো পাস হচ্ছে না এই সংসদে।
সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদের কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই- মর্মে মন্তব্য করেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের জন্য নতুন কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ বা ‘গণপরিষদ’ গঠনের প্রয়োজন নেই। নির্বাচিত এই জাতীয় সংসদই সংবিধানের নিয়মতান্ত্রিক সংশোধনীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে পারে। সংসদে এখন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই, জামাতায় কি চাইছে- সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরকারি দল কী করছে। গণপরিষদ প্রশ্নে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আগে থেকেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো নিজেদের বোধ-বুদ্ধি থেকে কিছু অধ্যাদেশ করেছে। এর মধ্যে অনেক অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক।
আপনার মতামত লিখুন :