

সিমোর্গ বিমানটি তৈরি করা হয়েছে ‘ইরান-১৪০’ বিমানের মূল কাঠামো বা প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে। তবে কেবল একটি কারখানা বা সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি একা বানাচ্ছে না। দেশটির খুচরা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও প্রকৌশলীদের নিয়ে তৈরি বিশাল এক প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক কাজ করছে এর পেছনে।
প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় টিকে থাকার তাগিদ আর বিদেশি পার্টসের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞার চাবুক—এমন এক কোণঠাসা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ডানা মেলতে যাচ্ছে ইরানের নতুন পরিবহণ বিমান ‘সিমোর্গ’। যেমনটা ফারসি সাহিত্যে কবির কাব্যে উঠে এসেছে একতাবদ্ধ হয়ে টিকে থাকার গল্প, ঠিক তেমনি কঠোর অবরোধের মুখে শত শত দেশি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ চেষ্টায় ডানা মেলছে এই নতুন আকাশযান। ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জানিয়েছে, দেশটির তৈরি এই পণ্যবাহী বিমানটি এখন প্রয়োজনীয় মান সনদ এবং সনদপত্র পাওয়ার চূড়ান্ত পর্বে রয়েছে। সব হিসাব-নিকাশ ঠিক থাকলে আগামী ফারসি বছর অর্থাৎ ১৪০৬ সালে (যা গ্রেগোরিয়ান দিনপঞ্জি অনুযায়ী ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের দিকে পড়ে) বাণিজ্যিকভাবে বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে সিমোর্গ।
ইরানের বিমান চলাচল খাত বহু বছর ধরেই নানামুখী বৈদেশীক বিধিনিষেধ ও যন্ত্রাংশের সংকটে ভুগছে। ফলে দেশে তৈরি বিমানের প্রয়োজনীয়তা কেবল আর কোনো প্রচারমূলক বা প্রতীকী প্রদর্শনীতে আটকে নেই; বরং এটি এখন দেশের আকাশপথে পণ্য পরিবহণের সত্যিকারের সংকট মোকাবিলার এক মোক্ষম অস্ত্র। সিমোর্গ বিমানটি মূলত কার্গো বা মালামাল আনা-নেওয়ার বিশেষ মিশনের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক ভাইস-প্রেসিডেন্সির মহাকাশ, পরিবহন এবং নগর উন্নয়ন সদর দপ্তরের সচিব শুকরি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সিমোর্গ প্রকল্পটিকে গতিশীল রাখতে গত বছর সরকারি সহায়তা পুরোপুরি দেওয়া হয়েছে। বিমানটি এখন আন্তর্জাতিক মান অর্জনের লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একে বলা যায় এর নির্মাণের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ধাপ। ইরান বিমান নির্মাণ শিল্প প্রতিষ্ঠান (হেসা) এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাথে মিলে প্রযুক্তিবিদরা কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে, বিমানের প্রয়োজনীয় এসটিসি (Supplemental Type Certificate) কিংবা টিসি (Type Certificate)—যা আকাশযান চলাচলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—তা দ্রুতই মিলে যাবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে সিমোর্গ বিমানটি তৈরি করা হয়েছে ‘ইরান-১৪০’ বিমানের মূল কাঠামো বা প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে। তবে কেবল একটি কারখানা বা সরকারি প্রতিষ্ঠান এটি একা বানাচ্ছে না। দেশটির খুচরা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও প্রকৌশলীদের নিয়ে তৈরি বিশাল এক প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক কাজ করছে এর পেছনে। বিমানের সাব-সিস্টেম নকশা, যন্ত্রাংশ পরীক্ষা ও মাননিয়ন্ত্রণের জটিল কাজগুলো সামলাচ্ছে এরাই।
প্রকল্পটির নির্মাণের আসনে থাকা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, গত বছরের কিছুটা জটিলতার কারণে বাস্তবায়নে কিছুটা দেরি হলেও ১৪০৬ ফারসি সালকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। আকাশে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে আর অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে বাতাস জোগাতে ইরানের এই নিজস্ব বিমান ‘সিমোর্গ’ কতদূর যেতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, এই বিমানের ‘সিমোর্গ’ নামটি এসেছে ফারসি সাহিত্যের এক অমর রূপকথা থেকে। সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের বিখ্যাত কাব্য ‘মানতিক আল-তাইর’-এ বলা হয়েছে, পরম রাজার খোঁজে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া হাজারো পাখির মধ্যে শেষ পর্যন্ত মাত্র ‘ত্রিশটি পাখি’ (ফারসিতে ‘সি-মোর্গ’) টিকে ছিল। কাফ পর্বতের চূড়ায় পৌঁছে তারা বুঝতে পারে, বাইরের কোনো রাজা নয়—তাদের এই একতা ও আত্মত্যাগেই লুকিয়ে আছে আসল শক্তি, তারাই সেই ‘সিমোর্গ’। বহুবছরের কড়া নিষেধাজ্ঞার মুখে দাঁড়িয়ে ইরানের শত শত প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই বিমান যেন ঠিক একইভাবে দেশটির স্বাবলম্বিতা ও একতাবদ্ধ লড়াইয়ের এক আধুনিক ‘সিমোর্গ’।
আপনার মতামত লিখুন :